আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'জঙ্গলে থাকার চেয়ে মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় ঘুমানো বেশি ভয়ঙ্কর'- দিল্লিতে গৃহহীনদের রাতের অভিজ্ঞতা
- Author, মৃদুলিকা ঝা
- Role, বিবিসি সংবাদদাতা
- Published
- পড়ার সময়: ১০ মিনিট
দিল্লির মেহরৌলি এলাকায় মেট্রো স্টেশনের কাছে ফুটপাথে শুয়ে ঘুমাচ্ছিল বছর দশেকের একটি মেয়ে। গত ২২শে জুন ভোরবেলায় এক ট্যাক্সিচালক তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেয়েটির মৃতদেহ গুরুগ্রাম-ফরিদাবাদ সীমান্তের কাছে ফেলে দেওয়া হয়। অভিযুক্তকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এই ঘটনা আরো একবার গৃহহীন নাবালিকা ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
রুজি-রুটির খোঁজে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ দিল্লিতে আসেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ পরিবারের সঙ্গে স্থায়ী বা অস্থায়ী বাসস্থানের বন্দোবস্ত করতে সক্ষম হন। কারো পক্ষে মাথার উপর ছাদ জোটানো সম্ভব হয় না এবং এক প্রকার বাধ্য হয়েই রাস্তার ধারে বা ফুটপাথের মতো জায়গায় দিন কাটান তারা।
মাথার উপর ছাদ ছাড়াই দিল্লিতে এইভাবে ঠিক কত সংখ্যক মানুষ বাস করছেন সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই।
তবে, গৃহহীন ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে এমন এক সংগঠন 'শহরি অধিকার মঞ্চ'-এর অনুমান ২০২৪ সালে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রায় তিন লাখ মানুষ গৃহহীন ছিলেন, এর মধ্যে নারীরাও আছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাস্তাই যাদের ঘর, তারা প্রতিটা রাতই নতুন ভয়কে সঙ্গী করে শুতে যান। কখনো বিরূপ আবহাওয়া তাদের ঘুম কেড়ে নেয়, কখনো দ্রুত গতিতে ধেয়ে আসা যান-বাহনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে মাথার উপরে ছাদহীনদের যে ভয়টা সবচেয়ে বেশি তাড়া করে ফেরে, তাহলো শ্লীলতাহানি এবং ধর্ষণের ঘটনা। এই ভয় এতটাই তীব্র যে অনেকে রাতগুলোয় অর্ধেক ঘুম অর্ধেক জেগে তাদের পুরো জীবন কাটিয়ে দেন।
মেহরৌলির ওই ঘটনার পর, দিল্লির বিভিন্ন জায়গা ঘুরে রাস্তায় বসবাসকারী শিশু-কিশোরী ও নারীদের অবস্থার খোঁজ নিয়েছে বিবিসি।
'ঘর থাকলে স্ত্রীকে খোলা জায়গায় রাখতাম?'
ঘটনাস্থল সংলগ্ন লাডো সরাইয়ের ফুটপাতে যেতেই চোখে পড়ল সারি সারি মানুষ।
এদের মধ্যে কয়েকজন নারী বেলুন বিক্রি করছিলেন, কেউ ফুল সাজাচ্ছিলেন, কেউ বা মূর্তি তৈরি করছিলেন। কেউ আবার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে কাজে ব্যস্ত।
চোখে পড়ল ফুটপাথের উপরেই রাখা তোশক। কোথাও লোহার তৈরি বেড়ার উপর কাপড় শুকাচ্ছে। ছোটো ছোটো কৌটোয় রাখা খাবার-দাবার। তীব্র দাবদাহ থেকে রেহাই পেতে কেউ আবার সঙ্গে স্ট্যান্ড ফ্যান রেখেছেন।
এই ফুটপাথেই বেলুন বিক্রি করছিলেন পূজা নামে এক নারী। তার কথায়, "যতই রোদ হোক, বৃষ্টি হোক, দিন কোনোমতে কেটে যায়। আসল সমস্যা শুরু হয় রাতে।"
"আশপাশ দিয়ে বহু লোক যায়। কেউ অশ্লীল কথা বলে, কেউ কাছে এসে বসে পড়ে। মাঝে মধ্যে অনেকে কাছাকাছি এসে শুয়ে পড়ে। মানা করলে আমাদের ধমক দিয়ে বলে- তুমি কি এই ফুটপাথ কিনে নিয়েছ?"
কাছেই বসে ছিলেন মিজ. পূজার স্বামী রোশন। তিনি বলেন, "শ্লীলতাহানির বিষয় নিয়ে আর কী বলব! খালি কোনোমতে বেঁচে আছি। ঘর থাকলে কি আর আমার স্ত্রীকে এভাবে খোলা জায়গায় রাখতাম?"
রাতে কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন জানতে চাইলে মি. রোশন বলেন, "কী করব? দিনের বেলায় অসম্পূর্ণ ঘুম পূরণ করি। কিন্তু রাত তো রাতই। চোখ লেগে যায়, আর তারপর ঠিক সেই একই ঘটনা ঘটে।"
রাজস্থানের ভিলওয়াড়ার বাসিন্দা ছিলেন এই দম্পতি। প্রায় চার বছর আগে তারা দিল্লি এসেছিলেন।
মিজ. পূজা বলেন, "আমারও এক মেয়ে আছে। তাকে আমি সঙ্গে এনেছিলাম। কিন্তু এখানে এই সমস্ত দেখার পর ওকে ওর দিদিমার কাছে রেখে আসতে হয়েছে। সেখানে অন্তত মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই তো আছে।"
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
'চাষ বা অন্য কাজ থাকলে দিল্লি কেন আসব?'
তারাও বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন না কেন জিজ্ঞাসা করলে, মি. রোশন বলছেন, "যদি চাষ-বাস বা অন্য কোনো কাজ থাকত, তাহলে এখানে কেন আসব? আমরা চার বছর ধরে দিল্লির রাস্তায় বাস করছি।"
তিনি বলেন, "মাঝে একটা ঝুপড়ি বানানোর চেষ্টাও করেছিলাম, কিন্তু পুলিশ বারবার এসে ভেঙে দিয়ে যায়। তারা বলে ঝুপড়ি বানাতে গিয়ে আমরা একদিন রাস্তাটাই দখল করে নেব।"
দু'জনে মিলে দিনে দুশো টাকা উপার্জন করেন এই দম্পতি। খুব বেশি হলে দিনে তিনশো টাকা রোজগার হয়।
তারা আয়ের একটা অংশ দিয়ে নতুন বেলুন কেনেন। কিছু টাকা দিয়ে দিনের খাবারের ব্যবস্থা করেন, আর কিছু টাকা মেয়ের কাছে পাঠানোর জন্য জমান।
এই দম্পতির কাছে জানতে চেয়েছিলাম তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে? মি. রোশনের তিক্ত হাসিই ছিল এই প্রশ্নের উত্তর।
ট্র্যাফিক লাইটের কাছে মাসির সঙ্গে থাকেন রশ্মি (নাম পরিবর্তন করা হয়েছে)। তার সমস্যা জানতে আলাদা করে প্রশ্ন করতে হয় না।
যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে ওঠেন, "এখন আমি উত্যক্ত করার ঘটনার হিসেব রাখা বন্ধ করে দিয়েছি। এর আগে আমি কোনো এক পাশে ঘুমাতাম। কিন্তু বেশ কয়েকবার এমন ঘটনা (শ্লীলতাহানি) ঘটার পর সব নারীরাই কম বয়সের মেয়েদের মাঝখানে রেখে ঘুমাতে শুরু করেন। একেবারে ছোট হলে মা তাকে বুকে আঁকড়ে ধরে ঘুমায়।"
বহু শিশু ঘুমন্ত অবস্থাতেই উধাও হয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
মিজ. রশ্মি বলছিলেন, "আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, ঘুমিয়ে পড়লে কারো হুঁশ থাকে? কিছু না কিছু ঘটে যায়। অনেক মায়ের সন্তানই ঘুমের মধ্যে উধাও হয়ে যায়।"
"তারা কান্নাকাটি করে। পুলিশের কাছে গেলেও ঠিকমতো বলতে পারে না। তারপর ফিরে এসে একইভাবে দিন গুজরান শুরু হয়।"
সমাজকর্মী ইয়োগিতা ভায়ানা নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেন। মিজ. রশ্মি যে অভিযোগ তুলেছেন, তারই প্রতিফলন মিলেছে এই সমাজকর্মীর কথাতেও।
'পিপল এগেইনস্ট রেপস ইন ইন্ডিয়া' নামক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ইয়োগিতা ভায়ানার কথায়, "(এই বিষয়ে) কোনো অফিশিয়াল স্টাডি (আনুষ্ঠানিক গবেষণা ) না থাকলেও রাস্তায় বসবাসকারী দশজন মেয়েদের মধ্যে নয়জনকেই যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়।"
"একবার, দু'বার- তারপর বারে বারে হতে থাকা এই জাতীয় ঘটনা একসময় এতটাই সাধারণ হয়ে যায় যে এক সময় এগুলোকে নিজেদের জীবনের অংশ বলে ভাবতে শুরু করেন তারা। প্রতিবাদ করা বন্ধ করে দেন। ঠিক এই কারণেই খুব কম সংখ্যক ঘটনার অভিযোগই দায়ের হয়।"
মিজ ভায়ানা বলেন, "মেহরৌলির ঘটনাটা মারাত্মক পর্যায়ের ছিল, তাই সেটা প্রকাশ্যে এসেছে। না হলে গৃহহীনদের সঙ্গে প্রতিদিনই কিছু না কিছু ঘটতে থাকে।"
তিনি বলেন, "প্রায় তিন বছর আগে আমার কাছে একজন নারীর মামলা এসেছিল। নৃশংসভাবে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছিল তাকে। তিন মাস এইমস (অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস)-এ ভর্তি ছিলেন তিনি। সুস্থ হয়ে ওঠার পর আমরা তাকে একটা নিরাপদ জায়গা দিয়েছি। কাজের ব্যবস্থাও করেছি।"
"বাচ্চা মেয়েদের অবস্থা আরও খারাপ। বাবা-মা ঘুমাচ্ছেন, সেও পাশেই ঘুমাচ্ছে। কিন্তু তুলে নিয়ে যায়, টেরও পাওয়া যায় না। তবে এরা (ফুটপাথে বসবাসকারী পরিবার) শেল্টারে (আশ্রয়কেন্দ্রে) যেতে চায় না।"
এর কারণও ব্যাখ্যা করেছেন এই সমাজকর্মী।
তার কথায়, "পথচারীরা এদের খাবার-দাবার দেয়, কম্বল দেয়। কিন্তু শেল্টারে তাদের মাথার উপর শুধুমাত্র ছাদ আছে। এই কারণেই অনেকে তাদের কাছে বিকল্প থাকা সত্ত্বেও রাস্তায় থাকে। যতক্ষণ না চরম কিছু ঘটছে।"
মেহরৌলির ফুটপাথকেই নিজের ঘর বানিয়েছেন মিজ. কৌশল। তার কথা বলার সময় নেই। তখন তিনি রান্না করছিলেন। এরপর একদফা ঘুমিয়ে নিয়ে সন্ধ্যায় নিয়ে ফুল বিক্রি করতে বের হবেন। তার মেয়ে বেলুন বিক্রি করবে।
মিজ. কৌশল বলেছেন, পরিবারে "যতজন সদস্য আছে, সবার কাজ বরাদ্দ করা আছে। তবেই খাবারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।"
কড়াইয়ে রান্না চাপিয়ে সমানে হাতা দিয়ে নাড়ছিলেন তিনি। আমরা কেন তার সঙ্গে কথা বলতে চাইছি সে বিষয়ে জানানোর পর মিজ. কৌশল তাড়াতাড়ি বলেন, "মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমালে ভয় হয় যদি কেউ ছোট ছেলেকে নিয়ে চলে যায়। রাতে একটু সজাগ থাকার জন্য দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিই।"
"ভাবুন তো, ২৪ ঘণ্টাই আমাদের রাস্তাতে থাকতে হয়। গাড়ির আওয়াজ, লোকজনের আওয়াজ, পুলিশের লাঠি... এমন পরিস্থিতিতে কী করে ঘুম হবে?"
"সারাদিন আমার চোখ এমন জ্বলতে থাকে যেন চোখে নুন পড়েছে। মাথা দপদপ করে। পেট হয়তো ভরা, কিন্তু ঘুম অর্ধেক। এইভাবে একদিন-দু'দিন না, আপনাকে পুরো জীবন কাটাতে হবে।"
রান্নার মাঝেই মিজ. কৌশলের কাছে ক্রেতারা এসে উপস্থিত হন। প্লাস্টিকের ইনডোর সুইমিং পুল কিনতে এসেছিলেন তারা।
কৌশল ইশারায় জানান, এতে হাওয়া ভরতে এক-আধ ঘণ্টা লেগে যায়। ক্রেতারা আসেন, দেখে চলে যান। তিনি জানালেন, রাতে ওই হাওয়া বের না করলে কেউ তাতে সূঁচ দিয়ে খোঁচা মেরে দেয়। তাদের কাছে এটা নিছকই করুণ মজা।
'জঙ্গলে থাকার চেয়ে মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় ঘুমানো বেশি ভয়ঙ্কর'
কাছেই বাস করা একটা পরিবার প্রতিমা তৈরি করে। ত্রিপলের নিচে প্রতিমা বানান তারা, আর ঘুমান ফুটপাথে।
এই পরিবারের প্রধান হলেন মিজ. মীরা। মধ্যবয়সী এই নারী জানিয়েছেন তারা আসলে রাজস্থানের বাসিন্দা।
রাজস্থানের ঠিক কোথায় তার বাড়ি জানতে চাইলে মিজ. মীরা বলেন, "আমি জানি না। দাদু থাকতেন হয়তো। আমার মা এখানে জন্মেছে। আমি এই ফুটপাতে জন্মেছি। আমার সন্তানরাও এখানে জন্মেছে।"
ত্রিপলের নিচের অংশে আমাকে নিয়ে গেলেন মীরা। সেখানে গণেশ ও দুর্গার অসমাপ্ত মূর্তি রাখা ছিল।
তিনি বলেন, "মৌসুম আসছে। প্রতিদিন তিনটি করে মূর্তি তৈরি করি। কিছু বিক্রি হয়ে গেছে, কিছু পড়ে থাকে।"
আগামী বছর বিক্রি হবে এই মূর্তিগুলো?
হাসতে হাসতে মিজ. মীরা বলেন, "দিল্লির এই মৌসুমে মানুষের হাড়-মাংস কিছুই ঠিক থাকে না, সেখানে মাটির তৈরি মূর্তি টিকবে কী করে? তাছাড়া পুলিশও মাঝে মাঝে ত্রিপল সরিয়ে দেয়।"
মেহরৌলির ঘটনাটি জানেন মিজ. মীরা। তিনি বলেন, "জঙ্গলে থাকার চেয়ে তরুণী মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় ঘুমানো বেশি ভয়ঙ্কর।"
"(জঙ্গলে) একটা সিংহ আসবে, একটা সাপ আসবে। আবার নাও আসতে পারে। এলে এমন হতে পারে যে তারা চুপচাপ চলে গেল।"
"কিন্তু মানুষ এখানে আসবেই আসবে। এমন কোনো রাত নেই যখন আমরা জেগে উঠি না বা চিৎকার করি না।"
তিনি বলেন, "মাঝেমধ্যে আমরা পুলিশের কাছেও যাই। তারা কী করবে? তারা বলে যান ঘরে গিয়ে থাকুন। কিন্তু কোথায় বাড়ি ভাড়া নেব? বাড়ি ভাড়া তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। আমরা এক মাসে এত টাকা আয় করি না।"
আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার অভিজ্ঞতাও জানিয়েছেন তিনি।
মিজ. মীরা বলেছেন, "শীতের সময় ছিল তখন আমি কয়েকবার আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানেও একটা অন্য পরিবেশ। লোকেরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে থাকে। সেখান থেকে ফিরে এসেছিলাম।"
'যতটা সম্ভব সাবধানে থাকি'
কিছুদিন আগে, আমরা আভ্যার (নাম পরিবর্তন করা হয়েছে) সঙ্গে দেখা করেছিলাম। বছর বারোর অ্যাভ্যা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে গিয়েছিল।
আমাদের প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ চুপ করেছিল এই কিশোরী। তারপর মৃদুস্বরে বলে ওঠে, "হলেই বা কী করব। মেয়েদের জাত, এ সব তো হবেই। যতটা সম্ভব সাবধানে থাকি।"
"পালা করে ঘুমাই আমরা। একজন তিন ঘণ্টা ঘুমায়। অন্যজন পরের তিন ঘণ্টা। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রাত কোনোমতে কেটে যায়।"
বছর বারোর আভ্যা থেকে শুরু করে ৫০-এর কাছাকাছি বয়সী মিজ. কৌশল-সবারই একই গল্প। তারা ঝলমলে রাজধানীর সেই অংশ, যা আড়ালে থাকলে তবেই দিল্লিকে দিল্লির মতো দেখাবে।
মেহরৌলি মামলা নিয়ে পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলার চেষ্টা করেছে বিবিসি।
ডিসিপি (দক্ষিণ) অনন্ত মিত্তল ফোনে বলেন, "আমরা ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই ব্যবস্থা নিই। বেশ কয়েকটা টিম গঠন করা হয় এবং তদন্ত শুরু হয়।"
"শত শত সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়। সেই কারণেই প্রায় ছয় ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্ত ধরা পড়ে এবং এফআইআর দায়ের করা হয়। পাশাপাশি আমরা আক্রান্ত পরিবারকে কাউন্সেলিং করি এবং নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাই।"
গৃহহীনদের, বিশেষত নারীদের জন্য দিল্লি পুলিশ কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে কি না এই প্রশ্নের জবাবে ডিসিপি বলেন, "গৃহহীনদের সুরক্ষার বিষয়টা একটা মাল্টি-এজেন্সি অ্যাপ্রোচ (একাধিক প্রশাসনিক বিভাগের দায়িত্ব বোঝাতে)। পুলিশ ছাড়াও অনেক প্রশাসনিক বিভাগ একসঙ্গে কাজ করে। সেটাই করা হচ্ছে।"
মেহরৌলির ঘটনার পর পদক্ষেপ
ডিসিপি অনন্ত মিত্তল বলেন, "আমরা প্রতিটা এলাকায় টহল দেওয়ার চেষ্টা করি এবং মানুষের উপর নজর রাখি। তাছাড়া আমরা জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছি যে, পুলিশ তাদের পাশে আছে।"
"যাই ঘটুক না কেন, আতঙ্কিত না হয়ে তারা আমাদের কাছে আসতে পারেন। বর্তমানে আমরা টহল বাড়িয়েছি। বাকি ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।"
মেহরৌলির ফুটপাতে পরিবারের সঙ্গে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশুটিকে অপহরণ করা হয়। ডিসিপি (দক্ষিণ) অনন্ত মিত্তলের দাবি, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি পেশায় ট্যাক্সিচালক। পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে ওই শিশুটিকে অপহরণ, ধর্ষণ ও খুনের কথা স্বীকার করেছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার পর অভিযুক্তকে আদালতে পেশ করা হলে তাদের দুই দিনের পুলিশি হেফাজত দেওয়া হয়েছিল।
২৫শে জুন আদালতে হাজির করা হলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দিল্লি পুলিশ কয়েক দিনের রিমান্ড চায়।
পাশাপাশি, পুলিশের দাবি ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়ার সময় ওই অভিযুক্ত একজন পুলিশকর্মীর সরকারি রিভলবার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং পুলিশের টিমকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। পাল্টা পদক্ষেপের সময় পুলিশের গুলি তার পায়ে লাগে। এরপর ওই ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পুলিশের উপর হামলা চালানোর অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে।
প্রায় চার দশক ধরে মাদকাসক্তি ও গৃহহীন ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করছেন সমাজকর্মী ড. রাজেশ কুমার। এই প্রসঙ্গে তার সঙ্গেও কথা বলেছে বিবিসি।
"এমনটা ঘটেই থাকে, শুধু অভিযোগ দায়ের হয় না।"
"গৃহহীনদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকেন নারীরা। এক্ষেত্রে বাচ্চা মেয়েরা চরম ভোগান্তির শিকার হয়। ঘুমের মধ্যেই তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধের শিকার হয় তারা।"
"মাঝে মাঝে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হয়। মেহরৌলির ঘটনাটা বিচ্ছিন্ন নয়। এমনটা ঘটতেই থাকে, শুধুমাত্র অভিযোগ দায়ের করা হয় না," বলছিলেন তিনি।
বিষয়টা বিশদে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। তার কথায়, "বাবা-মায়েরা জানেন না যে কিছু ঘটলে কী করতে হবে, কীভাবে পুলিশের কাছে যেতে হবে এবং কীভাবে অভিযোগ জানাতে হবে।"
"গৃহহীন যদি শিশু হয় এবং পরিবারের থেকে আলাদা বা একা রয়েছে এমনটা লক্ষ্য করা যায় তাহলে সেই ঘটনা রিপোর্ট করার ভিন্ন প্রক্রিয়া রয়েছে। যদি পেট্রোলিং স্কোয়াড জানতে পারে যে কোনো ছেলে বা মেয়ে শিশু রাস্তায় একা আছে, তবে তাকে অবিলম্বে শেল্টারে নিয়ে যাওয়া উচিত। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।"
তিনি বলেন, "পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যে-ই তাকে লক্ষ্য করুক না কেন প্রক্রিয়াটা একই। লোকেরা এই বিষয়ে জানে না আর এরই মাঝে ওই বাচ্চাদের নরকের সম্মুখীন হতে হয়।"
ড. রাজেশ কুমার এই প্রসঙ্গে অন্য এক সমস্যার কথাও তুলে ধরেছেন।
তার কথায়, "এটাও একটা সমস্যা যে দিল্লিতে গৃহহীনদের সংখ্যা বাড়ছে। সেই অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্র কম। কতজনের বাড়ি নেই এবং বিদ্যমান আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর ক্ষমতা কতটুকু, তা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার।"
দিল্লি আরবান শেল্টার ইমপ্রুভমেন্ট বোর্ডের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে দিল্লিতে প্রায় ২০০টা স্থায়ী শেল্টার আছে। এইমসের কাছেও কিছু শেল্টার আছে তবে সেগুলো গ্রীষ্মের পরে বন্ধ হয়ে যাবে।
দিল্লি আরবান শেল্টার ইমপ্রুভমেন্ট বোর্ডের তথ্য বলছে, মোট আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ১৫৫টা পুরুষদের জন্য। ২০টা শেল্টার পরিবারের জন্য এবং ১৭টা আশ্রয়কেন্দ্র নারীদের জন্য সংরক্ষিত।
তাছাড়া রিকভারি ও মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি কিছু আশ্রয়কেন্দ্র আছে।
দিল্লিতে গৃহহীনদের সংখ্যা কত?
এবার ফিরে আসা যাক সেই পুরোনো প্রশ্নে। রাজধানীতে কত সংখ্যক গৃহহীন মানুষ রয়েছেন?
দিল্লিতে গৃহহীনদের নিয়ে কাজ করা বেশ কয়েকটা সংগঠনের একটা 'শহরি অধিকার মঞ্চ' ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে পাঁচ রাত ধরে গণনা চালিয়েছিল।
সেই সময় দেড় লাখেরও বেশি মানুষ রাস্তায় দেখা গিয়েছে বলে তারা জানিয়েছে। অনেক এলাকায় প্রবেশাধিকারের অভাবে একটা বড় সংখ্যক মানুষ বাদ পড়েছিলেন। সে সব বিষয় মাথায় রেখে ওই সংগঠনের অনুমান ছিল যে রাজধানীতে গৃহহীনদের সংখ্যা তিন লাখের বেশি হতে পারে।
পরে এই বিষয়ে প্রেস বিবৃতিও জারি করা হয়, যেখানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তৈরি স্টেট লেভেল শেল্টার মনিটরিং কমিটিও এই গণনাকে সমর্থন করে।
গৃহহীনদের সঙ্গে সাক্ষাতের মাঝে বিবিসি মেহরৌলি এলাকায় পৌঁছায়, যেখানে মেয়েশিশুটিকে নৃশংসভাবে নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছিল।
ইতোমধ্যে সেই ফুটপাথে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সেখানে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই... না তাদের অস্তিত্বের কোনো চিহ্ন, না তাদের সরিয়ে ফেলার প্রমাণ।