ট্রাম্প-শি বৈঠক যেভাবে দুই পরাশক্তির সম্পর্ক নির্ধারণ করে দিতে পারে

    • Author, অ্যান্থনি জারখার
    • Role, উত্তর আমেরিকা সংবাদাদাতা
    • Author, লরা বিকার
    • Role, চীন সংবাদদাতা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক তিয়েনআনমেন স্কয়ারে কয়েক দিন ধরেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে বিশেষ এক প্যারেড বা বড় ও সুপরিকল্পিত কোনো আয়োজনের গুঞ্জন ছড়িয়েছে।

বড় এই ঘটনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল নীরবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে চীন কার্যত দৃশ্যমান একটি আয়োজনের জন্য প্রস্তুত।

এই সফরে আলোচনা, ভোজসভা এবং টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন অন্তর্ভুক্ত থাকবে; এটি প্রাসাদ সম্রাটদের প্রার্থনার স্থান ছিল, যেখানে তারা ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করতেন।

ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং- দুজনেই সম্ভবত আশা করবেন যে এই সফর ফলদায়ক হবে।

বিশ্বের দুই ক্ষমতাধর নেতার এই শীর্ষ বৈঠক আসন্ন অনেক বছরের জন্যও অনেক তাৎপর্যপূর্ণ একটি সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে।

মাসের পর মাস যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ট্রাম্পের কাছে তুলনামূলক কম অগ্রাধিকার পেয়েছে। তার মনোযোগ ছিল ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ, পশ্চিম গোলার্ধে সামরিক অভিযান এবং অভ্যন্তরীণ নানা বিষয়ে।

কিন্তু এই সপ্তাহে চিত্র পাল্টাবে।

বিশ্ব বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ, তাইওয়ানকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং উন্নত প্রযুক্তিতে প্রতিযোগিতা- সবই ঝুঁকির মুখে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ এবং ইরান সংঘাত শির জন্য খারাপ খবর হতে পারে; কিন্তু আদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে মনে হতে পারে- এগুলো তার জন্য একটি সুযোগ এবং তার হাতে শক্ত অবস্থান রয়েছে।

এই সফর ভবিষ্যতে সহযোগিতা বা সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

ইরান প্রশ্নে ভূমিকা?

মঙ্গলবার চীন যাওয়ার আগে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেছেন, তিনি চীনা নেতার সঙ্গে ইরান নিয়ে "দীর্ঘ আলোচনা" করবেন।

তৃতীয় মাসে পড়া এই যুদ্ধের ক্ষেত্রে চীন নীরবে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা নিতে চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের ক্ষেত্রে বেইজিং পাকিস্তানের সঙ্গে মধ্যস্থতায় যুক্ত হয়েছে।

মার্চ মাসে বেইজিং ও ইসলামাবাদ পাঁচ দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করে, যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা। পর্দার আড়ালে চীনা কর্মকর্তারা ইরানি সমকক্ষদের আলোচনায় বসার জন্যও উৎসাহিত করছেন।

শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের পরেও চীন যে এই যুদ্ধের সমাপ্তি চায়, এতে সন্দেহ নেই।

দেশটির অর্থনীতি ইতোমধ্যেই ধীর প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ বেকারত্বের সঙ্গে লড়ছে।

জ্বালানির দাম বাড়ায় পেট্রোকেমিক্যাল নির্ভর পণ্যের খরচ বেড়েছে, টেক্সটাইল থেকে প্লাস্টিক পর্যন্ত সবকিছুই এতে প্রভাবিত।

চীনের কিছু উৎপাদকদের জন্য খরচ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

চীনের বড় তেলের মজুত রয়েছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে তাদের অগ্রগতি জ্বালানি সংকটের প্রভাব কিছুটা কমিয়েছে। তবে ইরান যুদ্ধ চীনের রপ্তানিনির্ভর মন্থর অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে।

তবে চীন যদি যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করে, তবে এর বিনিময়ে কিছু প্রত্যাশা থাকবে।

গত সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির বেইজিং সফর মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব তুলে ধরার একটি ইঙ্গিত ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, "আমি আশা করি চীন তাকে প্রয়োজনীয় বার্তা দেবে যে, হরমুজ প্রণালিতে আপনারা যা করছেন তা আপনাদের আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করছে এবং আপনারাই এখানে দোষী।"

হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নতুন প্রস্তাবে চীন যেন বাধা না দেয়- সে ব্যাপারে চীনকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

আগের প্রস্তাবটিতে চীন ও রাশিয়া ভেটো দিয়েছিল।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক ও এডভোকেসি অ্যাডভাইজর আলি ওয়াইন বলেন, "আমি মনে করি, ইরানকে যদি স্থায়ীভাবে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে এটা স্বীকার করতে হবে যে- চীন একটি ভূমিকা পালন করতে পারে।"

ট্রাম্প অবশ্য তার দিক থেকে তেহরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে খুব একটা উদ্বিগ্ন নন।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানি তেল পরিবহনের জন্য চীন-ভিত্তিক একটি তেল শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আর গত সপ্তাহে এই সংঘাত চলাকালীন ইরানের প্রতি চীনের যেকোনো ধরনের সমর্থনকে গুরুত্বহীন বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।

গত সপ্তাহে তিনি বলেন, "পরিস্থিতি যেমন, তেমনই। আমরা যেমন করি, তারাও তেমন করে।"

তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ

তাইওয়ান প্রসঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন বিভ্রান্তিকর বার্তা দিয়েছে।

গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে ১১ বিলিয়ন বা ১১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তি ঘোষণা করে, যা চীনকে ক্ষুব্ধ করে।

তবে তাইওয়ানকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কম গুরুত্ব দিয়ে দেখিয়েছেন ট্রাম্প।

তিনি বলেন, "শি মনে করেন এটি চীনের অংশ, এটি তার সিদ্ধান্ত।"

তিনি আরও বলেছেন, তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্রকে তার নিরাপত্তার বিনিময়ে যথেষ্ট দেয় না।

গত বছর তিনি তাইওয়ানের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প "চুরি" করার অভিযোগ তোলেন।

রুবিও জানিয়েছেন, এই সফরে তাইওয়ান আলোচনায় থাকবে, তবে উত্তেজনা বাড়ানো নয়, বরং এড়ানোই এর লক্ষ্য।

তিনি বলেন, "তাইওয়ান বা ইন্দো-প্যাসিফিকের কোথাও কোনো অস্থিতিশীল ঘটনা ঘটুক, তা আমরা চাই না। এবং আমি মনে করি, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের জন্যই পারস্পরিকভাবে লাভজনক।"

চীনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, এই আলোচনায় তাইওয়ানকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই গত সপ্তাহে মার্কো রুবিওর সঙ্গে এক ফোনালাপে বলেন, তিনি আশা করছেন যুক্তরাষ্ট্র "সঠিক সিদ্ধান্ত" নেবে।

বেইজিং প্রায় প্রতিদিন তাইওয়ানের কাছে যুদ্ধবিমান ও নৌযান পাঠিয়ে তাদের ওপর সামরিক চাপ বাড়িয়ে চলেছে।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, ১৯৮২ সালে তাইওয়ান নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে প্রণয়ন করা ভাষার পরিবর্তনের জন্য চীনা কর্মকর্তারা চাপ দিচ্ছেন। ওয়াশিংটনের সর্বশেষ ঘোষিত নীতি হচ্ছে, তারা বর্তমানে তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না।

বেইজিং কি আরও জোরালো ভাষা- যেমন "যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে", এরকম বাক্য চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে?

এশিয়া সোসাইটির সেন্ট অন ইউএস-চায়না রিলেশন্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো জন ডিলুরি বলেন, "আমি মনে করি না প্রেসিডেন্ট শি এতে রাজি হবেন।"

"ট্রাম্প যদি এমন কিছু বলেন যা তাইওয়ান নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার মতো শোনায়, কারণ তিনি ভাষা ব্যবহারে খুব সতর্ক নন, তবুও চীনারা জানে এ ধরনের বক্তব্যকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ তিনি এক সপ্তাহ পরই ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট দিয়ে তার অবস্থান উল্টে দিতে পারেন," বলেন তিনি।

গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য আলোচনা

২০২৫ সালের বেশিরভাগ সময়জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নতুন বাণিজ্য যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিল, যা বিশ্ব অর্থনীতির ভিতকে কাঁপিয়ে দিতে পারতো।

ট্রাম্প বারবার শুল্ক বাড়ানো-কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছেন, কখনও তা ১০০ শতাংশও ছাড়িয়েছে।

চীন পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বিরল খনিজ রপ্তানি কমায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য আমদানি সীমিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের যেসব রাজ্যে ট্রাম্প সমর্থন পেয়েছেন, সেব রাজ্যের কৃষকরা এরফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শি এর বৈঠকের পর উত্তেজনা কিছুটা কমেছে।

ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রেসিডেন্টের একক শুল্ক আরোপ ক্ষমতা সীমিত হওয়াও প্রভাব ফেলেছে।

তবুও বেইজিংয়ে আলোচনার অনেক বিষয় রয়েছে।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনা বাড়াতে চাপ দেবেন।

চীন নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ দেবে যাতে তারা সম্প্রতি ঘোষিত অন্যায্য ব্যবসায়িক কার্যকলাপের বিষয়ে বাণিজ্য তদন্তটি প্রত্যাহার করে নেয়, যা ট্রাম্পকে চীনা পণ্যের ওপর পুনরায় উচ্চ শুল্ক আরোপ করার ক্ষমতা দিতে পারে।

এটি আমেরিকান পক্ষের জন্য জটিল হতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ডিফেন্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির ফিল নাইট চেয়ারের দায়িত্বে থাকা মাইকেল ও'হ্যানলন বলেন, "চীনের সব ধরনের অন্যায্য বাণিজ্যচর্চা নিয়ে তদন্ত থেকে সরে আসা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হতে পারে, কারণ এসব চর্চা এখনো ব্যাপক এবং বাজারকে বিকৃত করছে।"

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই সফরে ট্রাম্প প্রশাসন এনভিডিয়া, অ্যাপল, এক্সন, বোয়িংসহ অন্যান্য বড় কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদেরও সঙ্গে নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

চীন যদিও ট্রাম্পের প্রথম দফার প্রেসিডেন্ট মেয়াদের সময়ের তুলনায় এখন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ততটা নির্ভরশীল নয়, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার প্রয়োজন হওয়ায় এই বৈঠক সফল হোক- এটাই চাইবেন শি।

বর্তমানে ১২০টিরও বেশি দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন। তবে ট্রাম্পের সফরের সময় শি চাইবেন না যে তাকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী বলে মনে হোক।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের জন এল থর্নটন চায়না সেন্টারের পরিচালক রায়ান হ্যাস বলেন, "যতক্ষণ না সফরটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় এবং ট্রাম্প মনে করেন যে তাকে যথাযথ সম্মান দেখানো হয়েছে, ততক্ষণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এই অস্বস্তিকর স্থিতাবস্থা টিকে থাকবে। অন্যদিকে, যদি ট্রাম্প মনে করেন তাকে অসম্মান করা হয়েছে বা অবহেলা করা হয়েছে, তাহলে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে পারে।"

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ

চীন ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার প্রতিযোগিতায় রয়েছে। দেশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মানবসদৃশ রোবটের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। এগুলো শি জিনপিংয়ের ভাষায় "নতুন উৎপাদনশীল শক্তি"-র অংশ, যা চীনের অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেবে বলে তিনি আশাবাদী।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নীতিনির্ধারক মনে করেন, চীনের সরকারি নীতি হলো- তাদের নিজস্ব শিল্প খাতকে এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিকে নিজেদের আওতায় আনা বা সরাসরি চুরি করা।

এর ফলে সর্বাধুনিক মাইক্রোপ্রসেসর রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যদিও এ নিয়ে মার্কিন নির্মাতাদের আপত্তি রয়েছে।

চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাপ টিকটকের মালিকানা ও পরিচালনা সংক্রান্ত জটিল ইস্যুটির সফল সমাধান প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র‑চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বিরল ইতিবাচক পরিণতি ছিল, যেখানে সাধারণত অভিযোগ ও সন্দেহ-অবিশ্বাসই বেশি দেখা যায়।

এই প্রবণতা এখন প্রতিফলিত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবস্থা উন্নয়নের প্রতিযোগিতায়, যা সম্ভবত আধুনিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি।

বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করছে যে ডিপসিকের মতো চীনা কোম্পানিগুলো আমেরিকান এআই চুরি করছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের জন এল থর্নটন চায়না সেন্টারের ইংই মা বলেন, "এআইকে ঘিরে এক ধরনের শীতল যুদ্ধের সূচনা পর্ব দেখা যাচ্ছে।"

তিনি বলেন, "হোয়াইট হাউজ আমেরিকান এআই মডেলের 'শিল্পপর্যায়ের' চুরির অভিযোগ তুলেছে চীনের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে বেইজিং নাকি মেটাকে সিঙ্গাপুরভিত্তিক চীনা প্রতিষ্ঠিত এআই স্টার্ট‑আপ ম্যানাস অধিগ্রহণ থেকে বিরত রাখার পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রকৃত প্রতিযোগিতা হচ্ছে কে কার মডেল অনুকরণ করছে তা নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের আধুনিক এআই তৈরি করতে সক্ষম প্রতিভা অর্জন নিয়ে।"

চীনের রোবটগুলো নানা প্রদর্শনীতে কুংফু নৃত্যভঙ্গি প্রদর্শন করতে পারে এবং বেইজিংয়ে আয়োজিত ম্যারাথনে মানুষের চেয়েও দ্রুতগতিতে দৌড়াতে সক্ষম।

চীনা কোম্পানিগুলো এসব রোবটের বাহ্যিক কাঠামো তৈরিতে দক্ষতা দেখালেও, তাদের অনেকেই এখনো নতুন এসব সৃষ্টির 'মস্তিষ্ক' বা প্রোগ্রামিং উন্নয়নে কাজ করছে।

সেরা প্রযুক্তি গড়ে তুলতে চীনা কোম্পানিগুলোর উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার চিপ দরকার, আর সেগুলো আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

এখানেই বেইজিং তার বিরল খনিজ খাতের ওপর থাকা প্রভাব কাজে লাগাতে পারে। এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত, যার প্রতি ট্রাম্পের স্পষ্ট আগ্রহ রয়েছে।

বিশ্বে উৎপাদিত রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজের প্রায় ৯০ শতাংশই চীন প্রক্রিয়াজাত করে, যা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে উইন্ড ফার্ম, এমনকি জেট ইঞ্জিনসহ আধুনিক সব প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য।

সুতরাং, একটি সমঝোতার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র পেতে পারে চীনা রেয়ার আর্থ, আর বিনিময়ে দিতে পারে উচ্চমানের চিপ। এটি অনেকটা চীনের নিজস্ব হরমুজ প্রণালির মতো- যে কোনো সময় তারা সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে।

নানামুখী নীতিগত বিষয় সামনে থাকা সত্ত্বেও, ট্রাম্পের এই সফর হবে খুবই সংক্ষিপ্ত, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার নির্ধারিত বৈঠক ও কর্মসূচি নিয়ে দ্রুতগতির এক সফর।

দুই নেতার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য সময় খুব বেশি নাও থাকতে পারে, তবে এমন একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ ও আলোচনার গতিপথ এবং দুই পরাশক্তির পারস্পরিক সম্পর্ককে আগামী বহু বছরের জন্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।