আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
২০২০ সালে বলিউডের এক তারকার ম্যানেজারের মৃত্যুর মামলা কেন আবারও তদন্ত করা হচ্ছে
- Author, গীতা পান্ডে
- Role, নারী বিষয়ক সম্পাদক, ভারত
- Published
- পড়ার সময়: ৪ মিনিট
দুই হাজার বিশ সালের চৌঠা জুন যখন কোভিড-১৯-এর প্রাণঘাতী ঢেউ ভারতে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন তারকা ব্যবস্থাপক দিশা সালিয়ান তার বাবা সতীশ সালিয়ানকে একটি পুলিশ হেল্পলাইনে ফোন করে জেনে বলতে বলেন যে তার ভ্রমণ করা নিরাপদ হবে কি না।
তিনি একটি বিজ্ঞাপনী প্রচারণার শুটিং নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন এবং অগ্রিম পারিশ্রমিক হিসেবে পাওয়া চেকের একটি ছবি তিনি তাঁর বাবা-মাকে দেখিয়েছিলেন।
এটাই ছিল শেষবার, যখন সালিয়ান দম্পতি তাদের ২৮ বছর বয়সী কন্যাকে জীবিত দেখেছিলেন।
আট ও নয়ই জুনের মধ্যবর্তী রাতে সতীশ সালিয়ানকে পুলিশ একটি হাসপাতালে ডেকে পাঠায়, যেখানে তিনি জানতে পারেন তার একমাত্র সন্তান মারা গেছেন।
পুলিশ জানায়, ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মুম্বাইয়ের একটি ভবনের ১২তম তলা থেকে পড়ে গিয়েছিলেন দিশা সালিয়ান।
হাসপাতালে দিশার বন্ধুরা বলেন, তিনি মদ্যপান করেছিলেন এবং দুর্ঘটনাবশত পড়ে গিয়েছিলেন।
পরে পুলিশ জানায়, তাদের তদন্তে দেখা গেছে তার মৃত্যু আত্মহত্যা ছিল।
কিন্তু এ মাসের শুরুতে বোম্বে হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)-কে মামলাটি পুনরায় চালু করে দিশার মৃত্যুর বিষয়ে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেয়।
গত বছর সতীশ সালিয়ান দায়ের করা একটি আবেদনের পর আদালত এই নির্দেশ দেয়। তিনি শুরু থেকেই বলে আসছিলেন যে তার মেয়ের মৃত্যু আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনা নয় এবং দাবি করেছিলেন, তাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
তার অভিযোগ, কিছু জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা প্রমাণ নষ্ট করেছেন এবং আত্মহত্যার একটি মিথ্যা গল্প তৈরি করেছেন, যাতে অভিযোগকৃত অপরাধে জড়িত কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রভাবশালী রাজনীতিককে রক্ষা করা যায়। সতীশ সালিয়ানের এই অভিযোগ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটিকে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত মৃত্যুর ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
দোসরা সেপ্টেম্বরের এক আদেশে বিচারপতি সারাং ভি কোটওয়াল এবং রঞ্জিতসিংহ রাজা ভোঁসলে পুলিশের সমালোচনা করেন এবং বলেন, ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে দুই ধাপে পরিচালিত তদন্তে "খুব বেশি স্পষ্ট অসঙ্গতি" রয়েছে।
বিচারকরা জোর দিয়ে বলেন, তারা কোনো "ক্ষুদ্র বিচার" করছেন না, তবে যোগ করেন যে "পুলিশের পরিচালিত তদন্ত যত উত্তর দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলেছে"।
তারা পুলিশি নথিপত্র তৈরিতে অযৌক্তিক বিলম্বের বিষয়টি উল্লেখ করেন। এছাড়া যে স্থানে মরদেহ পড়েছিল, সেখানে কোনো রক্ত পাওয়া যায়নি এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত আঘাতগুলো পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় না বলেও মন্তব্য করেন।
"এটি মেনে নিতে আমাদের কষ্ট হচ্ছে," বিচারপতিরা লিখেছেন।
আদালতের সবচেয়ে বড় সমালোচনাগুলোর একটি ছিল, পুলিশ ঘটনাটিকে শুধু সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে তদন্ত করেছে এবং কোনো এফআইআর (ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট) দায়ের করেনি। অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার পর পুলিশের এ ধরনের নথি প্রস্তুত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এ পর্যন্ত সতীশ সালিয়ানের অভিযোগগুলো কেবল অভিযোগই, তবে তার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে গত সপ্তাহে সিবিআই একটি এফআইআর নথিভুক্ত করেছে এবং সেগুলোই নতুন তদন্তের ভিত্তি হয়েছে।
বিবিসি এই এফআইআর পর্যালোচনা করেছে এবং মামলার আদালতের আদেশও পড়েছে।
সতীশ সালিয়ানের অভিযোগের সারাংশ তুলে ধরে আদালতের আদেশে বলা হয়, মৃত্যুর সময় দিশা 'কোয়ান এন্টারটেইনমেন্ট' নামে একটি তারকা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন এবং বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতকে প্রতিনিধিত্ব করতেন।
আদেশে আরও বলা হয়, "প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কিছু আপত্তিকর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি জানতে পেরেছিলেন। তিনি সেই তথ্য রাজপুতকে জানান এবং রাজপুত সরল বিশ্বাসে তা অন্যদের কাছে প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত সেই তথ্য আবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছেই পৌঁছে যায় এবং তাকে চুপ করিয়ে দিতে হত্যা করা হয়।"
দিশার মৃত্যুর পর রাজপুত একটি ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে শোক প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি লিখেছিলেন, "এটি অত্যন্ত বিধ্বংসী সংবাদ। দিশার পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। তোমার আত্মা শান্তিতে থাকুক।"
শুরুর দিকে দিশার মৃত্যু তেমন আলোচনায় আসেনি। কিন্তু এক সপ্তাহও না পেরোতেই সুশান্ত সিং রাজপুতকে নিজ বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
পুলিশ তার মৃত্যুকেও আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে এবং জানায়, তিনি মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিলেন এবং এর চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর অভিনেত্রী প্রেমিকা রিয়া চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজপুতের বাবা অভিযোগ করেছিলেন, তার ছেলের আত্মহত্যায় রিয়ার ভূমিকা ছিল।
তার ছেলের কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল, এমন বক্তব্যও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
তীব্র জনরোষের পর সুশান্তের মামলাটিও সিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গত বছর সংস্থাটি তদন্ত শেষ করে জানায়, তিনি আত্মহত্যাই করেছিলেন এবং তার মৃত্যুর ঘটনায় চক্রবর্তী বা তার পরিবারের কোনো ভূমিকা ছিল না।
সিবিআইয়ের কাছে দায়ের করা এফআইআরে সতীশ সালিয়ান দাবি করেছেন, দিশা এবং রাজপুতের মৃত্যু পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
সতীশ সালিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, দিশা অভিনেতার সঙ্গে "মাদক পাচার, শিশু নির্যাতন এবং এক সাবেক মন্ত্রী ও আরও কয়েকজনের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বেআইনি কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত অপরাধসূচক ও আপত্তিকর তথ্য" ভাগাভাগি করেছিলেন। এই তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে তারা একটি সংবাদ সম্মেলন করার পরিকল্পনাও করেছিলেন।
এফআইআরে বলা হয়েছে, "সেটি ঠেকাতে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রক্ষা করতে সুপরিকল্পিত একটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করা হয়। ভুক্তভোগীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় এবং পরে প্রমাণ গোপন বা জাল করা হয়। অপরাধ আড়াল করতে এবং অভিযুক্তদের রক্ষা করতে আত্মহত্যার একটি ভুয়া গল্প তৈরি করা হয়।"
আদালত তার আদেশে বলেছে, এফআইআর নথিভুক্ত করার অর্থ এই নয় যে কারও বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা "যৌক্তিক সন্দেহের পর্যাপ্ত ভিত্তি" খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত কাউকে অভিযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
কিন্তু এফআইআরে রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন রাজনীতিক, পুলিশ কর্মকর্তা এবং বলিউড অভিনেতার নাম উল্লেখ থাকায় রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, অস্বীকার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগের মধ্যে মামলাটি ভারতে সংবাদ শিরোনাম দখল করে আছে।
সন্তানের জন্য ন্যায়বিচার পেতে ছয় বছর ধরে লড়াই করে যাওয়া সতীশ সালিয়ান বলেন, আদালত নতুন তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পর তিনি "কিছুটা শান্তি" অনুভব করছেন।
তিনি বিবিসিকে বলেন, "দিশা খুবই মেধাবী ছিল। পড়াশোনায় ভালো করত এবং অনেক পড়াশোনা করত। তার হৃদয় ছিল সোনার মতো। সে খুব সাহায্যপ্রবণ ছিল। সে ছিল আমাদের একমাত্র সন্তান এবং আমাদের খুব ভালোবাসত।"
তিনি জানান, তার স্ত্রী এখনও মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর বাস্তবতা মেনে নিতে পারেননি এবং বিষণ্নতায় ভুগছেন।
তিনি বলেন, "যারা আমার মেয়ের ক্ষতি করেছে, তাদের মৃত্যুদণ্ড চাই। যারা তাকে কষ্ট দিয়েছে, তাদেরও যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হওয়া উচিত। আমার কাছে দিশার জন্য ন্যায়বিচার মানে সেটাই।"