তিন বছরের মধ্যে প্রথম ব্যাংক সুদের হার বাড়ালো যুক্তরাষ্ট্র

    • Author, মাইকেল রেইস
    • Role, বাণিজ্য বিষয়ক প্রতিবেদক, ওয়াশিংটন ডিসি, বিবিসি
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির লাগান টানার লক্ষ্যে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ফেডারেল রিজার্ভ'।

আগামীতে সুদের হার আরও বাড়ানো হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছেন কর্মকর্তারা।

যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যাংক সুদের হার কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার বিরোধিতা সত্ত্বেও ফেডারেল রিজার্ভের নীতি নির্ধারকরা সর্বসম্মতিক্রমে সুদের হার ৩.৫-৩.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.৭৫-৪ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করেছেন।

"মূল্যস্ফীতি এখন অনেক বেশি এবং লম্বা সময় ধরেই সেটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে," বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ।

মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত 'বিচক্ষণ' এবং 'দায়িত্বশীল' একটি পদক্ষেপ।

আগে বিরোধিতা করলেও সুদের হার বৃদ্ধির ঘোষণা আসার পর অবশ্য মি. ওয়ার্শের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তারপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যে বোর্ডে সুদের হারের বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটিকে 'ক্ষ্যাপাটে' বলে মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

সুদের হার বৃদ্ধির পর যারা এখন ব্যাংক ঋণ, বন্ধকি ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ড নিতে চান, তাদের খরচ আগের চেয়ে কিছুটা বাড়বে। অন্যদিকে, ঋণের বদলে যারা সঞ্চয়ের দিকে ঝুঁকবেন, তারা অবশ্য লাভবান হবেন।

নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান মি. ওয়ার্শ বলেন, তাদের নেতৃত্বের মধ্যে 'আশাবাদী মনোভাব' থাকলেও এটাই বাস্তবতা যে, মূল্যস্ফীতি এখনো একটি সমস্যা হয়েই রয়ে গেছে।

অন্য অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো, তারাও মুদ্রাস্ফীতির হার দুই শতাংশ বা তারও নিচে রাখায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছেন। যদি 'পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে' সেটি লক্ষ্যমাত্রার ওপরেই রয়েছে বলে উল্লেখ করেন ফেড প্রধান।

দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। ফলে এটি নিয়ে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগের একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাইকারি বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে। সেই কারণেই অনেক পণ্য ও পরিষেবার দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে।

যদিও মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা মি. ওয়ার্শ বলছেন যে, কোনো একক পণ্যের মূল্যের ওপর তারা কোনো প্রভাব রাখতে পারেন না। সেটা জ্বালানি তেলের দামই হোক, কিংবা মুদি দোকানের খাদ্যদ্রব্যই হোক।

তবে দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি যেন আর না বাড়ে, সেই লক্ষ্যে তারা কাজ করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, কর্মসংস্থানসহ বৃহত্তর অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পণ্যমূল্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার দিকে মনোনিবেশ করছে ফেডারেল রিজার্ভ। মূল্যস্ফীতি কমে আসলে কম সচ্ছল ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।

একটি দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি যখন বেশি থাকে, তখন সেখানকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত ব্যয় নিরুৎসাহিত করা এবং সঞ্চয়ে উৎসাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। এভাবে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে আশা করেন তারা।

তবে এক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সুদের হার বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের উপকৃত হলেও ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে উৎসাহ কম দেখায়। এতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

কী বার্তা দিচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে যখন মি. ওয়ার্শের নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছিল, তখন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা অভিযোগ বলেছিলেন যে, তিনি হবেন ট্রাম্পের 'হাতের পুতুল'।

ফেড পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও অনেকে ধরে নিয়েছিলেন যে, সুদের হার ব্যাপকভাবে কমানোর জন্য তিনি ট্রাম্পের দাবিগুলো পূরণ করবেন। কারণ মি. ওয়ার্শের আগে যিনি ওই দায়িত্ব ছিলেন, সেই জেরোম পাওয়েল ব্যাংক সুদের হার না কমানোয় ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।

বুধবার সুদের হার বৃদ্ধির যে ঘোষণাটি এসেছে, সেটির মাধ্যমে ট্রাম্পকে কি কোনো বার্তা দেওয়া হচ্ছে?

"প্রেসিডেন্টের বিষয়ে আপনাকে বলার মতো আমার কাছে কিছু নেই," হেসে বলেন ওয়ার্শ।

এদিকে, সুদহার বৃদ্ধির ঘোষণার পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, "আমি কেভিনের (ওয়ার্শ) ওপর ভরসা করছি, কিন্তু তিনি খুবই কঠিন একটি বোর্ডের সামনে পড়েছেন"।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, "আর সুদের হার অনেক বেশি। এগুলো সঙ্গত নয়...আমি কেভিনের সঙ্গে কথা বলেছি। তাকে বলেছি, 'তুমি বরং বোর্ডের পক্ষেই ভোট দাও, কারণ তাতে কিছু যায় আসবে না।'

"বোর্ডটি খুবই ক্ষ্যাপাটে, অত্যন্ত রাজনৈতিকও বটে,' যোগ করেন তিনি।

এর আগে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেরর পোস্টে ট্রাম্প বলেছিলেন, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুদের হার কমান, এবং সেটা দ্রুত!"

কেমন প্রভাব পড়বে?

ক্যাপিটল হিলের ডেমোক্র্যাটরা বলেছেন, সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ঋণ নেওয়া এখন আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে এবং এর ফলে আরও বেশি সংখ্যক আমেরিকান ঋণগ্রস্ত হবে।

"এর ফলে সবকিছুর দাম আরও বেড়ে যাবে," বলেছেন সিনেটের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার।

"এর কারণ হলো ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন না কীভাবে অর্থনীতি চালাতে হয়," যোগ করে তিনি।

সুদের হার বাড়ানোর কারণে এখন ঋণের খরচ বাড়বে। বিশেষ করে, যারা ঋণ করে বাড়ি কিনতে চাচ্ছেন, তাদের ব্যয় বাড়বে। সেইসঙ্গে, ক্রেডিট কার্ড ও ব্যক্তিগত ঋণের খরচও বেড়ে যাবে।

সুদহার বৃদ্ধির ঘোষণা জানামাত্রই গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ব্যাংকগুলোর মধ্যে জেপি মরগ্যান, কিকর্প এবং বিএনওয়াই তাদের 'প্রাইম লেন্ডিং রেট' ৬.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে।

গত এক বছরে মর্টগেজের খরচ বাড়লেও তা ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ স্তরের নিচে রয়েছে।

ফ্রেডি ম্যাকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩০ বছর মেয়াদী ঋণের গড় সুদের হার এখন ৬.৭৬ শতাংশ। আর ১৫ বছর মেয়াদী ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ৬.০৯ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বাড়ির মালিকের ৩০ বছর এবং ১৫ বছর মেয়াদী মর্টগেজ রয়েছে। 'ফিক্সড ডিল' হওয়ায় সুদের হারের পরিবর্তন তাদের মাসিক কিস্তির ওপর সেভাবে প্রভাব ফেলবে না।

কিন্তু উচ্চ সুদের হার তাদের প্রভাবিত করতে পারে, যারা নতুন করে মর্টগেজ নিতে চান।

ফেডের সুদের হার কোন দিকে যাবে, সেবিষয়ে নিজের মতামত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা মি. ওয়ার্শ। তবে তার বেশিরভাগ সহকর্মী নীতি নির্ধারক বলেছেন যে, তারা বিশ্বাস করেন এই বছরের শেষ নাগাদ সুদের হার আবারও বাড়তে পারে এবং সেটি বেড়ে ৪ থেকে ৪.২৫ শতাংশ হতে পারে।

নীতি নির্ধারকদের মধ্যে কেউ কেউ এমন কথাও বলেছেন যে, ২০২৮ এবং ২০২৯ সালে সুদের হার কমতে শুরু করতে পারে। তবে তার আগে আগামী বছর সুদের হার আরও বেড়ে ৪.২৫ থেকে ৪.৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, আগামী বছরগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি হ্রাস পাবে এবং সেটি ২০২৯ সালের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে কমে ফেডের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাবে।

উল্লেখ্য যে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভই কেবল ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে পড়েছে- বিষয়টি এমন নয়। ইউরোপসহ অন্য দেশগুলোও একই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।

এ অবস্থায় মূল্যস্পীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত সপ্তাহে ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছে।

এছাড়া ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত জানাতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।