খেলাপি ঋণ, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ, পুনঃতফসিল, দেউলিয়া - এসব শব্দের অর্থ কী?

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ে আলোচনা প্রায়ই সামনে আসে। কখনো বলা হয় খেলাপি ঋণ বেড়েছে, কখনো ঋণ পুনঃতফসিলের (রিশিডিউলিং) খবর আসে, আবার কখনো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হওয়ার ঘটনা শিরোনাম হয়।।
উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকার স্থিতি ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশই ছিল 'ডিস্ট্রেসড লোন' – অর্থাৎ, এমন ঋণ যা খেলাপিতে পরিণত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে ছিল।
সহজভাবে বলতে গেলে, দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ঋণ স্বাভাবিকভাবে পরিশোধ হচ্ছিলো না।
এই প্রতিবেদনে 'ডিস্ট্রেসড লোন'-এর পাশাপাশি 'ডিফল্টেড' বা 'ব্যাড লোন', 'লোন রিশিডিউলিং (ঋণ পুনঃতফসিল)', 'ব্যাংকরাপ্সি (দেউলিয়াত্ব)'সহ এ সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হবে। এও দেখা হবে যে প্রতিটি ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ছবির উৎস, Getty Images
খেলাপি ঋণ
খেলাপি ঋণ বা অনাদায়ি ঋণ, ইংরেজিতে যাকে বলে ডিফল্ট লোন বা ব্যাড লোন, কিংবা নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল)।
এটি হলো এমন ঋণ, যার কিস্তি বা সুদ নির্ধারিত সময়মতো পরিশোধ করা হয়নি এবং ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী সেটি খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অর্থাৎ, যা একেবারেই আদায়যোগ্য না, সেটিকেই খেলাপি ঋণ হিসেবে দেখানো হয়।
সাধারণত ৯০ দিন বা তার বেশি সময় ধরে ঋণ পরিশোধ করা না হলে ব্যাংক সেটিকে খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে নন-পারফর্মিং লোন বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
সেই খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "সামষ্টিক যে পরিসংখ্যান, তাতে বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এই খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের ওপরে পৌঁছেছে। এর মাঝে সরকারি, বেসরকারি, ইসলামি – সকল ঘরানার ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান আছে।"

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
"১০০ টাকার মাঝে যদি ৩০-৩৫ টাকাই অনাদায়ী পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে সেই দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা যে ধ্বংসের কিনারে পৌঁছেছে, তা ধরে নেওয়া যায়" উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "খেলাপি ঋণের বৈশ্বিক মানদণ্ড হলো দুই শতাংশ। এমনকি, বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, কিংবা পাকিস্তানেও এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ চার-পাঁচ শতাংশের মাঝে সীমাবদ্ধ।"
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের উচ্চ হারের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের দুর্বলতা, অডিট ও তদারকিতে অনিয়ম বা যোগসাজশ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে খাটিয়ে ঋণ গ্রহণ, ঋণের অর্থ অপব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর নজরদারির অভাব – সব মিলিয়েই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
"বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের পর অনেক ঋণগ্রহীতা গা ঢাকা দিয়েছেন এবং সাথে টাকাও পাচার করেছেন। এটা হলো এখন সামগ্রিক ব্যর্থতার দায়ভার।"
তবে খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের সমস্যা না। এটি পুরো অর্থনীতিতেই এটি প্রভাব ফেলে। কারণ ব্যাংকের তারল্য, নতুন বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। আরও সহজ করে বললে, খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায় এবং পুরো আর্থিক খাতে তার প্রভাব পড়ে।

ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ
সব ঝুঁকিপূর্ণ বা ডিস্ট্রেসড ঋণ খেলাপি ঋণ নয়। ডিস্ট্রেসড লোন বলতে এমন ঋণকে বোঝায়, যা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হয়নি, তবে ঋণগ্রহীতার আর্থিক অবস্থা বা ঋণ পরিশোধের ধারা দেখে ভবিষ্যতে খেলাপি হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম জাহিদ এ নিয়ে বলেন, "এটা এখনও মন্দ ঋণ বা খেলাপি ঋণ হিসেবে শ্রেণিকৃত হয়নি। তবে এটি যেকোনো সময় খেলাপি ঋণে পরিণত হতে পারে। কিছু সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু এখনো অনাদায়ী ঋণের পর্যায়ে যায়নি।"
তিনি জানান, এ ধরনের ঋণ আগেভাগে শনাক্ত করা গেলে ব্যাংক বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানোর সুযোগ পায়। এজন্য এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের উচিৎ ঋণগ্রহীতার ওপর নজরদারি বাড়ানো, তাদের সঙ্গে আলোচনা করা, প্রয়োজন হলে ঋণের বিপরীতে থাকা জামানত (কোল্যাটারাল) পুনর্মূল্যায়ন করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কাউকে সরাসরি খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তাকে সতর্ক করা হয়।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না হলে, অর্থাৎ, ৯০ দিনের বেশি বকেয়া থাকলে, ঋণটিকে ডিস্ট্রেসড বা উচ্চ ঝুঁকির ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, বলছিলেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images
ঋণ পুনঃতফসিল
ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে ঋণের কিস্তি বা সুদ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিশেষ শর্তে ব্যাংক ঋণ পরিশোধের সময়সূচি নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে।
এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ঋণ পুনঃতফসিল বা লোন রিশিডিউলিং।
পুনঃতফসিলের আওতায় ঋণের মেয়াদ বাড়ানো, কিস্তির সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ বা নতুন শর্তে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়।
যেসব ব্যবসা সাময়িক সংকটে পড়ে কিন্তু পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের জন্য এটি একটি সহায়ক ব্যবস্থা হতে পারে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, "যারা অনাদায়ী হয়ে গেছে, তারা পরে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিদ্যমান সরকারি নীতিমালার আওতায় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পেতে পারে।"
"এরপর নতুন কিস্তির সূচি নির্ধারণ করা হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই সূচি অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ করতে হয়। অনেকটা নতুন ঋণের মতো করেই পরিশোধের কাঠামো তৈরি করা হয়।"
এক্ষেত্রে সুদের হার একই থাকে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "সুদের হার কমানো হয় নাকি বাড়ানো হয়, তা নেগোশিয়েশনের ওপর নির্ভর করে। এটা বোর্ডের সিদ্ধান্ত।"
তবে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং এক্ষেত্রে আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ছবির উৎস, Getty Images
দেউলিয়াত্ব
যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আর তার নিয়মিত আয়, সম্পদ বা অন্য কোনো উপায়ে দেনা পরিশোধ করতে পারে না, তখন সেটি দেউলিয়াত্ব বা ব্যাংকরাপ্সি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে বে কাউকে কেবল ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেউলিয়া বলা হয় না; সাধারণত এটি একটি আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঋণগ্রহীতার আর্থিক অবস্থা, সম্পদ, দায় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়।
অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, "যখন ঋণগ্রহীতা আর একেবারেই ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না, তার যে জামানত আছে, ওটা বিক্রি করে দিয়েও রিকভার করা সম্ভব না, তখন বিষয়টি আদালতে যায় এবং আদালত তখন দেউলিয়া ঘোষণা করতে পারে।"
তবে দেউলিয়াত্ব মানেই সব ঋণ মওকুফ হয়ে যাওয়া নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার স্বার্থ বিবেচনায় একটি সুশৃঙ্খল ও আইনসম্মত সমাধান নিশ্চিত করা।
ঋণ পুনরুদ্ধার
ঋণ পুনরুদ্ধার বা লোন রিকভারি বলতে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বকেয়া ঋণ আদায়ের জন্য নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে বোঝায়।
কোনো ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে প্রথমে সাধারণত ব্যাংক তার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং ঋণ পরিশোধে উৎসাহিত করার চেষ্টা করে।
কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থরহলে ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিলের মতো বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করতে পারে।
তাতেও সমাধান না হলে ঋণের বিপরীতে রাখা জামানত বিক্রির উদ্যোগ, আইনি নোটিশ, মামলা বা সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

ছবির উৎস, Getty Images
অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলছিলেন, এখানে ইচ্ছাকৃত খেলাপি এবং সত্যিই ব্যবসায়িক সংকটে পড়ে ঋণখেলাপি মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।
"একদল আছেন, যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি। তারা ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করে অন্য খাতে বিনিয়োগ করে বা অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করে। তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত মামলা, জামানত বাজেয়াপ্ত করা এবং প্রয়োজনে নিলামের মাধ্যমে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া উচিৎ।"
কিন্তু "কেউ কেউ আছেন, যারা অর্থনৈতিক মন্দা, যুদ্ধ পরিস্থিতি, বা আমদানি-রপ্তানিতে বাধার মতো যৌক্তিক কারণে অনেক ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারেন। তাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকের উচিৎ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ বা অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা। কারণ একটি গাছ যদি সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি কেটে ফেলার চেয়ে পরিচর্যা করে বাঁচিয়ে তোলা বেশি উপকারী," বলছিলেন তিনি।
তিনি জানান, কোনো ঋণগ্রহীতাকে দেউলিয়া ঘোষণা করা ব্যাংকেরও কাম্য নয়। কারণ, দেউলিয়া হয়ে গেলে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়, নতুন ঋণ পাওয়ার সুযোগ নষ্ট হয় এবং সামাজিক ও আর্থিকভাবে নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়। তাই আদালতে দেউলিয়া ঘোষণার পর্যায়ে যাওয়ার আগে ব্যাংকগুলো মূল অর্থ উদ্ধার করার চেষ্টা করে।
তবে আদালত যদি কাউকে দেউলিয়া ঘোষণা করেই দেয়, তখন ব্যাংক কি ক্ষতির সম্মুখীন হয়?
উত্তরে অধ্যাপক জাহিদ বলেন, "কয়েক ধরনের লোন আছে। যেমন, সিকিউরড লোন মানে ১০০ টাকার বিপরীতে ১০০ টাকা। অর্থাৎ, কারও জামানত হিসেবে রাখা জমির মূল্য ১০ কোটি হলে তাকে লোন দেওয়া হয় ১০ কোটি টাকাই। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব ক্ষেত্রে সার্ভেয়ার দিয়ে যোগসাজশ করে অনেকসময়, জমির দাম ১০ টাকা হলে দেখায় ১০০টাকা।"
এমন পরিস্থিতি জামানতের সম্পদ বিক্রি করেও ব্যাংক তার ঋণ ফেরত পায় না।
"আবার কিছু আছে ইনসিকিউরড লোন। কেউ দুই কোটি টাকার গাড়ি কিনবে। সে হয়তো ৫০ শতাংশ লোন নিচ্ছে। আবার ক্রেডিট কার্ড পুরোটাই হলো জিরো পার্সেন্ট সিকিউরিটি।"








