আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
রাউন্ড অব সিক্সটিনে কে কার মুখোমুখি, হার-জিতের নিশ্চয়তা কতটা?
- Author, সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ
- Role, অতিথি লেখক
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
ফিফা যখন ঘোষণা দিয়েছিলো যে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ৪৮টি দল খেলবে এবং খেলার সংখ্যা বেড়ে মোট ১০৪টি হবে, তখন অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে অনেকগুলো ম্যাচ একপেশে হবে, আর নতুন ও র্যাংকিং পিছিয়ে থাকা দলগুলো বড় দলের সামনে উড়ে যাবে।
কিন্তু, রাউন্ড অফ ৩২ পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটেনি। বরং তথাকথিত ছোটদলগুলো পাল্লা দিয়ে লড়েছে র্যাংকিংয়ে শীর্ষে থাকা দলগুলোর সাথে, টান টান উত্তেজনার সব খেলা উপভোগ করেছে সারা দুনিয়ার দর্শকেরা।
বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সাথে কেপ ভার্দের ম্যাচটার কথাই ধরা যাক। মাত্র লাখ পাঁচেক জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দে এইবার প্রথম বিশ্বকাপে খেলছে, বিশ্ব র্যাংকিং কিংবা ফুটবলের ঐতিহ্য কোনো কিছুতেই আর্জেন্টিনার সঙ্গে দলটির তুলনা চলে না। কিন্তু, গ্রুপ পর্যায়ে প্রাক্তন দুই চ্যাম্পিয়ন স্পেন আর উরুগুয়ের বিপক্ষে ড্র করার পর লিওনেল মেসির দলের বিরুদ্ধেও সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করেছে আফ্রিকার দলটি।
নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে ড্র করার পর অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আবার পিছিয়ে যায় কেপ ভার্দে। কিন্তু, ১০৩ মিনিটের মাথায় সিডনি লোপেস কার্বাল তর্কযোগ্যভাবে এই টুর্নামেন্টের সেরা গোলটি করে আবার সমতা ফেরান। যদিও শেষতক এক আত্মঘাতী গোলে তারা হেরে যায়, কিন্তু ছাপ রেখে যায় লড়াকু মানসিকতার, আর প্রমাণ করে দেয় যে এই বিশ্বকাপে কোনো দলকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
ব্যাপারটি টের পেয়েছে চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। মানসিক দৃঢ়তার জন্য বিখ্যাত দলটিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে দিয়েছে দারুণ লড়াই করা প্যারাগুয়ে।
আর আর ইউরোপের আরেক পরাশক্তি, তিনবারের ফাইনালিস্ট নেদারল্যান্ডকে বিদায় করেছে মরক্কো। অবশ্য মরক্কো গত আসরের সেমিফাইনাল খেলা দল, র্যাংকং-এ ছয় নম্বর, এই টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের বিপক্ষে দাপটের সঙ্গে ড্র করেছে। আফ্রিকার এই দলটি আরো বহুদূর যেতে পারে।
রাউন্ড অফ ১৬ এর প্রথম খেলাতেই মুখোমুখি হবে মরক্কো আর অন্যতম স্বাগতিক কানাডা। উত্তর আমেরিকার দেশটি বলতে গেলে 'দারুন' খেলেই এই পর্যন্ত এসেছে। স্বাগতিক হওয়ার সুযোগ নিয়ে দলটি ভালো লড়াই দিতে পারে।
জার্মানিকে হারানো প্যারাগুয়ে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স। এই টুর্নামেন্টে বড় দল আর ছোট দলের পার্থক্য কমে আসলেও ফ্রান্সই সম্ভবত একমাত্র দল যারা পরিষ্কার ফেভারিটের মতো খেলছে। এমবাপ্পে, ডেম্বলে, ওলিসেদের নিয়ে গড়া দলটি চার ম্যাচে ১৩টি গোল করেছে এবং প্রচুর গোলের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রচণ্ড ফর্মে থাকা দলটির সঙ্গে খেলা যে কোনো দলের জন্যই কঠিন হবে। তবে, জার্মানিকে হারানোর পর প্যারাগুয়ের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে থাকবে।
এর পরের ম্যাচটি হবে ব্রাজিল বনাম নরওয়ে। জাপানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলে এই রাউন্ডে উত্তীর্ণ হলেও ব্রাজিল এখনো পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন দলের মতো খেলতে পারছে না। ব্রাজিল দলের জন্য দুশ্চিন্তা ইনজুরি সংকট।
নেইমার এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে মাত্র ১৪ মিনিট খেলেছেন। ইনজুরিতে আছেন দলের অন্যতম ভরসা রাফিনহা এবং মিডফিল্ডার পাকেতা। নরওয়ের গোল মেশিন হালান্ডকে সামলাতে হিমশিম খেতে হতে পারে ব্রাজিলের ডিফেন্সকে।
আর বিশ্বকাপের সাম্প্রতিক আসরগুলোতে নকআউট পর্বে ইউরোপীয় দলের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের রেকর্ডও চিন্তার কারণ হবে দলটির সমর্থকদের জন্য।
যেমন চিন্তায় থাকবে ইংলিশ সমর্থকেরা। হ্যারি কেনের দারুন জোড়া গোলে কঙ্গো বাধা পেরিয়ে আসলেও ইংল্যান্ড এই রাউন্ডে খেলবে স্বাগতিক মেক্সিকোর বিপক্ষে। চার দশক পর নক আউট ম্যাচ জেতা মেক্সিকো এখনো পর্যন্ত চার ম্যাচের চারটিতেই জিতেছে, আর স্বাগতিক দর্শকদের দারুন উৎসাহ দলটিকে অনুপ্রেরণা দেবে।
মেক্সিকোর আরো একটি রেকর্ড ইংল্যান্ডকে বিচলিত করবে। এখন পর্যন্ত দলটি এই বিশ্বকাপে কোনো গোল খায়নি। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রাও আছেন ভালো ফর্মে।
আরেক স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রও দুর্দান্ত ফর্মে আছে। গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ১০ জনের দল নিয়েও দলটি ২-০ গোলে জিতেছে বসনিয়া হার্জেগোভেনিয়ার বিপক্ষে। ফলে, এই যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করা সহজ হবে না বেলজিয়ামের জন্য।
এক সময় ফিফা র্যাংকিং এ এক নম্বরে থাকা দলটির সেরা খেলোয়াড় কেভিন ডি ব্রুইনার বয়স ৩৫ পেরিয়েছে, রোমেলু লুকাকুর ৩৩। গ্রুপ পর্যায়ে মাত্র একটি জয় পাওয়া বেলজিয়াম দ্বিতীয় রাউন্ডে সেনেগালের বিপক্ষে ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল। দলটিকে ছন্নছাড়া দেখাচ্ছিলো। তবে, দুই মিনিটের মধ্যে দুইটি গোল এবং অতিরিক্ত সময়ে আরেকটি গোল দিয়ে দারুনভাবে ম্যাচটি জিতে নেয় ইউরোপীয় দলটি। বেলজিয়াম বনাম যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচটি এই রাউন্ডের অন্যতম সেরা ম্যাচ হওয়ার আশা করাই যায়।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
তবে, এই রাউন্ডে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে এই রাউন্ডের একমাত্র অল ইউরোপীয় লড়াইটি। স্পেন ও পর্তুগাল উভয়টিকেই এই আসরের ফেভারিটের তালিকায় রেখেছেন অনেকেই। তবে দুই দলের মধ্যে বিজয়ীই কেবল কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারবে।
কলম্বিয়ার পেছনে থেকে গ্রুপ শেষ করা পর্তুগালের মিডফিল্ডকে এই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ধরা হলেও দলটি সেই অনুসারে পারফর্ম করতে পারছে না। একই কথা খাটে দলের সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বেলায়। চল্লিশ পেরোনো রোনালদো দ্বিতীয় রাউন্ডে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে পেনাল্টিতে গোল পেলেও বাকি ম্যাচে ছিলেন নিস্প্রভ। রোনালদোর চির প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি যেখানে একের পর এক গোলের রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছেন, সেখানে তিনি ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছেন। দেখার বিষয় এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রোনালদো কী করতে পারেন।
রোনালদোর জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা হতে পারে একটি তথ্য যে, আট বছর আগে রাশিয়া বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে তিনি হ্যাট্রিক করেছিলেন।
অবশ্য, ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেনও এই টুর্নামেন্টে দারুন ফর্মে আছে। প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করলেও এর পরের ম্যাচগুলোতে দাপটের সঙ্গে জিতেছে দলটি। শুধু যে গোল দেওয়াতেই দক্ষতা তাই নয়, এখন পর্যন্ত এই টুর্নামেন্টে মেক্সিকোর পাশাপাশি স্পেনই একমাত্র দল যারা এখনো গোল খায়নি।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
রাউন্ড অফ ১৬ এর শেষদিনের খেলায় মুখোমুখি হবে সুইজারল্যান্ড ও কলম্বিয়া। বিশ্ব আসরে খুব বড় দল না হলেও এই দুইটি দলই দারুন গোছানো ফুটবল খেলছে। এখন পর্যন্ত অপরাজিত দল দুইটির মধ্যে দারুন একটি প্রতিদ্বন্দ্বীতা হওয়ার কথা। আর, এই খেলায় যেই জিতুক শেষ আটের প্রতিপক্ষের জন্য তা চিন্তার কারণ হবে।
আর সেই প্রতিপক্ষ হওয়ার কথা আর্জেন্টিনার। লিওনেল মেসির দল রাউন্ড অফ ১৬-এ মুখোমুখি হবে আফ্রিকার দল মিশরের যারা এইবারই প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে উন্নীত হয়েছে। তবে, ম্যাচটি আর্জেন্টিনার জন্য অতটাও সহজ হওয়ার কথা না।
এই বিশ্বকাপে ফর্মে থাকা মিশরের সবচেয়ে বড় নাম মোহামেদ সালাহ। তিনি লিভারপুলের হয়ে গত এক দশকে অনেক ট্রফি জিতেছেন, নিজেকে প্রমাণ করেছেন যুগের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে। মেসির মতো সালাহর জন্যও এই বিশ্বকাপটিই হতে পারে শেষ সুযোগ। এর ফলে তিনি মরিয়া হয়ে খেলবেন।
সালাহ ছাড়াও এই দলে আছেন ম্যানচেস্টার সিটির তারকা খেলোয়াড় ওমর মারমূশ। আর এই টুর্নামেন্টে তারা দেখিয়েছে যে এককাট্টা হয়ে খেলে যে কোনো দলকেই তারা হারিয়ে দিতে পারে।
টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত অপরাজিত থাকা মিশরের সাথে প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনার দারুন মিল আছে। দুইদলেই আছেন একজন করে মেগাস্টার, আর দুইদলই তাদের নেতার পেছনে দারুন একটা দল হয়ে খেলছে।
মেসি ম্যাজিকে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনা সব বাধাই পেরিয়ে এসেছে। 'অপার্থিব' পারফর্ম করে মেসি মাত্র চার ম্যাচে সাত গোল করেছেন, প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে ২০ গোল পূর্ণ করেছেন। কিন্তু, মেসি বনাম সালাহর দ্বৈরথে কে জেতে তা বলা শক্ত। বিশেষত আরেক আফ্রিকান দল কেপ ভার্দের দুরন্ত প্রতিরোধ দেখার পর আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কোনোভাবেই নিশ্চিত থাকার সুযোগ নেই।
বিশ্বায়নের পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ফুটবল বিশ্বের দলগুলোর পার্থক্য কমিয়ে আনছে। আফ্রিকা হোক বা লাতিন আমেরিকা, খেলোয়াড়েরা পৃথিবীর সেরা লীগগুলোতে চষে বেড়াচ্ছেন। প্রযুক্তির কল্যাণে নিমিষেই খেলোয়ড়দের তথ্য উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে, সহজেই গভীর বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে। ফলে, ফুটবল ঐতিহ্য না থাকা দলগুলাও মনোবল আর ইচ্ছাশক্তি যোগ করে নিজেদের খেলা আরো বিকশিত করছে।
এই পর্যন্ত বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে মাত্র আটটি দল শিরোপা জিতেছে। সেই দলগুলোর মধ্যে একটি, ইতালি, এবার বিশ্বকাপেই খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। একটি প্রথম রাউন্ডে আরেকটি দ্বিতীয় রাউন্ডে বাদ পড়েছে।
এতদিন বিশ্বকাপের ফেভারিট ধরা হতো ইউরোপের কয়েকটি এবং ল্যাটিন আমেরিকার দুইটি দল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে। কিন্তু, এবার দুই আমেরিকা মিলিয়ে সাতটি দল শেষ ষোলতে উন্নীত হয়েছে। যেই দুইটি আফ্রিকার দল এই পর্যায়ে এসেছে উভয়েই আরো বহুদূর যেতে পারার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
সব মিলিয়ে, চরম উত্তেজনার এই বিশ্বকাপে কোনো দলের পক্ষেই নির্ভার হয়ে থাকার সুযোগ নেই।
প্রথম দুই রাউন্ডেই যেই পরিমাণ অনিশ্চয়তা আর উত্তেজনা এই বিশ্বকাপ দেখিয়েছে, রাউন্ড অফ ১৬ এর আটটি ম্যাচে তা কমবে বলে মনে হয় না। উত্তেজনার বিশ্বকাপে দারুন অনিশ্চিয়তার আটটি ম্যাচের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছে দুনিয়াজুড়ে ফুটবল দর্শকেরা।