আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই খামেনির দাফন সম্পন্ন
- Author, ভিকি ওং
- Author, ম্যাট স্পিভে
- Author, ট্যাবি উইলসন
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
বৃহস্পতিবারও যুক্তরাষ্ট্র যেমন ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, ইরানও পাল্টা জবাব হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোয় মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা করেছে।
এদিকে পর্যবেক্ষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা 'নাটকীয়ভাবে' কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা বৃহস্পতিবার মোট ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালির আশেপাশের কিছু এলাকাও ছিল। আগের দিন বুধবার ৮০টি টার্গেটে হামলার কথা জানানো হয়েছিল।
ইরানের দাবি, গত দুই দিনে এসব হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন।
দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালানো হয়েছে। প্রদেশটির উপ-গভর্নরের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়। তবে সবশেষ এসব হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।
জবাবে কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে থাকা মার্কিন সম্পদের ওপর হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইরান। বৃহস্পতিবার তেহরান জর্ডান ও ইরাকের বিভিন্ন স্থাপনায়ও হামলা চালায় বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জানানো হয়।
এদিকে, সাত দিনব্যাপী শেষকৃত্য অনুষ্ঠান শেষে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হয়েছে উত্তর-পূর্ব দিকে তার নিজ শহর মাশহাদে। একই সঙ্গে নিহত তার পরিবারের চার জন সদস্যকেও দাফন করা হয় সেখানে।
দাফন উপলক্ষে মাশহাদের রাস্তায় ইরানের পতাকা হাতে মানুষের ঢল নামে। এ সময় কিছু মানুষের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার হুমকিসংবলিত প্ল্যাকার্ডও দেখা যায়।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, রাজধানী তেহরানের সঙ্গে মাশহাদ শহরের সংযোগকারী সেতু ও একটি রেলপথ যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খামেনি নিহত হন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বশেষ মার্কিন হামলাকে 'গুরুতর যুদ্ধাপরাধ' হিসেবে উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা মার্কিন প্রশাসনকে 'অশুভ ও মানসিক বিকারগ্রস্ত' বলে অভিহিত করেছে।
বৃহস্পতিবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী কোনারাকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় একজন কর্মকর্তা ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থাকে জানান, দেশটির নৌবাহিনীর একটি স্থাপনায় "শত্রুপক্ষ" হামলা চালিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, গত কয়েক ঘণ্টায় ইরানের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র কোনো হামলা চালায়নি।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির পাঁচটি প্রদেশে গত দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন।
মার্কিন হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের আক্রমণের খবর জানা গেছে; এর মধ্যে রয়েছে বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণ, কুয়েতের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা এবং কাতারের নিরাপত্তা সতর্কতা জারি।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র "এখনো শেখেনি যে, ভয় দেখানো আর প্রতিশ্রুতি ভাঙার বিষয়টি আর বিনা মাশুলে পার পাওয়ার মতো নয়"।
"স্পষ্ট করে বলছি, আপনারা হামলা করলে পাল্টা হামলার মুখে পড়বেন।"
পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি "মার্কিন হুমকির" মাধ্যমে নয়, কেবল ইরানের ব্যবস্থাপনাতেই উন্মুক্ত থাকবে বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সর্বশেষ হামলার উদ্দেশ্য ছিল "বাণিজ্যিক জাহাজ ও নিরীহ বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করা"।
তাদের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যেদেশটির উপকূলজুড়ে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক রসদ সরবরাহ-সংক্রান্ত অবকাঠামো ছিল। সেন্টকম আরও জানায়, "সর্বশেষ এই হামলাগুলো আগের রাতের সফল আক্রমণাত্মক অভিযানের ধারাবাহিকতা।"
স্বাধীন ট্যাংকার মালিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারট্যাঙ্কো-এর মেরিন পরিচালক ফিল বেলচার বলেন, উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার পর ওমান-সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ দিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজের সংখ্যা এখন "এক অঙ্কে" নেমে এসেছে।
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩০টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করছে। এক সপ্তাহ আগে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০টি, আর চলতি বছরের শুরুতে ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করতো।
বিবিসি রেডিও ৪-এর টুডে অনুষ্ঠানে বেলচার বলেন, গত মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে।
"সহিংসতার এই চক্র, ইতিবাচক ও নেতিবাচক খবরের এই ওঠানামা ব্যবসা এবং নাবিক—উভয়ের ওপরই বিশাল প্রভাব ফেলছে", বলেন তিনি।
বুধবার রাতে বন্দর আব্বাসে আটটি বিস্ফোরণের ঘটনার কথা জানায় ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। একই সঙ্গে দক্ষিণ ইরানের সিরিক ও জাস্ক—উভয় বন্দরে দুটি করে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, আবু মুসা দ্বীপেও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে। দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।
মার্কিন হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, চাবাহারে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে এবং বুশেহরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি'র একটি ব্যারাকে আগুন লেগেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে চাবাহারের একটি সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে।
এর আগে বুধবার সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানায়, গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক নৌপথে অবাধে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের বিরুদ্ধে "সাম্প্রতিক অযৌক্তিক আগ্রাসনের" জন্য তারা ইরানকেই দায়ী করছে।
বুধবার গভীর রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান "কিছুক্ষণ আগে" যোগাযোগ করেছে এবং তারা "খুবই মরিয়া হয়ে" একটি চুক্তি করতে চায়।
ট্রাম্প আরও বলেন, "আমি শুধু জানি না তারা চুক্তি করার যোগ্য কি না। আমার সন্দেহ, তারা চুক্তি মেনে চলবে কি না—এটাই মূল সমস্যা।"
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক - এমওইউ সই হওয়ার পর থেকে বর্তমান সংঘাতই দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গত মাসে ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখন "শেষ"।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "আমি আর তাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। তারা জঘন্য। জানেন জঘন্য বলতে কী বোঝায়? তারা জঘন্য। তারা অসুস্থ মানসিকতার মানুষ।"
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে লিখেছেন, "আমরা অশালীনতার জবাব অশালীনতা দিয়ে দিই না; আমরা জবাব দিই কাজে—নির্ভয়ে এবং সর্বোচ্চ সাহসিকতার সঙ্গে।"
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া চুক্তিতে মোট ১৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে ছিল ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, যে সময়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথা; হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা; এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা এখনো শেষ হয়নি। তবে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি মনে করেন ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও আলোচনা করা "সময়ের অপচয়"।