আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে বার বার মাজারে হামলা, নেপথ্যে যত কারণ
- Author, তাফসীর বাবু
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
ইসলাম বিকৃতির অভিযোগ এনে গত শনিবার কুষ্টিয়ায় পীরের দরগা হিসেবে পরিচিত 'শামীম বাবার দরবার শরিফে' যখন হামলা হয়, তখন এর প্রধান আব্দুর রহমান শামিম ভেতরেই ছিলেন।
আব্দুর রহমান শামিম নিজেকে পীর হিসেবে পরিচয় দিতেন।
সেই সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন দরগার খাদেম জামিরন নেসা।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, 'পীর' ইসলামের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয় এরকম কথা ছড়ানো হচ্ছিলো সবখানে।
তিনি বলেন, "বিভিন্নজন নানাকথা বলছিল। আমরা শুনছিলাম যে, গ্রামের মানুষ আসবে আলোচনা করতে। পীর বাবা বলতেছিলো যে, আমার যদি ভুল হয়, আমি ওদেরটা মানবো। কিন্তু ওরা আমার সঙ্গে কথা বলুক। বাবা আলোচনা করতে চাইলো। কিন্তু ওরাতো কথা বলার কোনো সুযোগই দেয় নাই।"
জামিরন নেসা বলেন, শেষমুহূর্তেও আব্দুর রহমান শামিম আলোচনার চেষ্টা করেছিলেন।
"ওরা যখন এক/দেড়শো মানুষ চলে আসলো। সবার হাতে লাঠি-অস্ত্র ছিলো। খালিহাতে কেউ ছিলো না। তখনও বাবা বলছে যে আমি যাবো না, ওদের সঙ্গে কথা বলবো। বাবা ঘর থেকে দুই হাত তুলে বলতেছিলো যে, থামো! কিন্তু ওরা কোন কথাই শোনেনি।"
ঐদিন এলাপাতাড়ি হামলা, মারধরের শিকার হয়ে পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় দরগার পীর হিসেবে পরিচিত হওয়া আব্দুর রহমান শামীমের।
সপ্তাখানেক আগে কুষ্টিয়ার এই ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তুলেছে।
এর মাত্র একদিন আগেই ঢাকায় সমকামী সন্দেহে হামলার শিকার হন বেশ কয়েকজন।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসেবে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৮৮টি। এরমধ্যে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনাও আছে।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় মবের ঘটনা বিশেষত: ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আইন হাতে তুলে নেয়ার ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা ছিল সব মহলে। সেসময় বলা হচ্ছিলো, 'রাজনৈতিক' সরকার না হওয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুর্বলতার কারণে এরকমটা হচ্ছে।
তবে নির্বাচনের পর একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলেও মবের ঘটনা থেমে নেই।
দেখা যাচ্ছে, ইসলাম রক্ষার কথা বলে এরকম হামলার ঘটনা ঘটলেও সরকার সেটা থামাতে ব্যর্থ হয়েছে।
কুষ্টিয়ার ঘটনাতেও নিহতের ভাই বাদি হয়ে যে মামলা করেছেন, সেখানে নাম উল্লেখ করা চার আসামীর দুই জনই দুটি ধর্মভিত্তিক দলের। এরমধ্যে একজন জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যজন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। যদিও দুই দলই ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হামলার আগে 'ধর্ম অবমাননার' ট্যাগ
কুষ্টিয়ার ঘটনায় 'কোরআনের অপমান' এবং 'ধর্ম অবমাননার' ট্যাগ দিতে ব্যবহার করা হয়েছিল দরগার পীরের পুরনো ভিডিও।
তার অনুসারীরা দাবি করেন, বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ 'কাট করে' নতুন ভিডিও বানানো হয়েছে, তারপর ছড়ানো হয়েছে।
গত দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে 'ধর্মের অবমাননার' অভিযোগ তুলে একের পর এক মাজারে হামলা হয়েছে। রাজবাড়ি, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে এসব হামলায় অংশ নিতে দেখা গেছে হাজার হাজার মানুষকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, মূলত: কোরআনের অপমান কিংবা ইসলাম রক্ষার কথা বলে প্রথমে মানুষকে উত্তেজিত করা হয়, তারপর হামলার ঘটনা ঘটে।
"যখন ধর্মীয় বিষয়টা সামনে আনা হয়, ধর্ম অবমাননার কথা বলা হয় তখন কিন্তু সাধারণ মানুষও হয় সেটার সঙ্গে গা ভাসিয়ে দেয় অথবা কোন প্রতিবাদ করে না। ফলে বাংলাদেশে যেটা হয়েছে যে, তৌহিদি জনতার নামে ইসলামকে পূঁজি করে একটা নিয়ন্ত্রণবাদী আদর্শের চর্চা হচ্ছে।"
তার মতে, যেহেতু ধর্ম ব্যবহারের কৌশল কাজ করছে, সেহেতু এটা অনেকেই ব্যবহার করছেন।
এবং এর পেছনে শুধু যে রাজনীতি থাকে তেমনটাও না। আধিপত্য বিস্তার, লুটপাটসহ এটার একটা অর্থনৈতিক তাৎপর্যও আছে।
তিনি বলেন, "দেখবেন এসব ঘটনায় একটা পক্ষ আছে যারা লুটপাট করে। এমনকি এখানে জায়গা-জমি দখলেরও বিষয় থাকে। ফলে শুধু ধর্ম অবমাননাই অনেকসময় মূল বিষয় থাকে না।"
কুষ্টিয়ায় পীরের দরগায় হামলার ঘটনাতেও লুটপাট ঘটেছে। এ ঘটনায় নিহত পীরের ভাই যে মামলা করেছেন, সেখানে মাজারের সম্পদ এবং স্বর্ণালঙ্কার লুট হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন মামলার বাদি।
এছাড়া হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ও মাজারের খাদেম জামিরন নেসাও বিবিসিকে বলেন, হামলার সময় একটি পক্ষ ভাঙচুরের সঙ্গে 'লুটপাটেও অংশ নিয়েছিল'।
ধর্মীয় নেতাদের বয়ানে 'সতর্কতার' কথা কেন উঠছে?
রাজবাড়িতে মাজারে হামলা কিংবা কুষ্টিয়ায় দরগায় হামলার যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলোতে দেখা যায় কখনও ইসলামবিরোধী ট্যাগ কিংবা কখনও ধর্ম অবমাননার অভিযোগগুলোকেই প্রথমে সামনে আনা হয়।
যেখানে আবার ভূমিকা থাকে স্থানীয় কোনো মাদ্রাসা কিংবা ধর্মীয় নেতার।
বাংলাদেশে ইসলামী গবেষক ও ঢাকার উত্তরায় জামিয়া দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ড. ওয়ালীয়ুর রহমান অবশ্য বলছেন, তার ভাষায়, এসব সহিংসতার সঙ্গে 'বড় আলেম' বা ধর্মের কোন সংযোগ নেই।
তিনি বলেন, "এগুলোর পেছনে বড় আলেমদের কোন নির্দেশনা আসলে লাগে না। দেখা যায় যে তরুণ কিংবা একেবারেই অশিক্ষিত লোকেরা যারা হয়তো শুধু জুমআ'র নামাজ পড়ে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়ে না। দেখা যায় তারাই মসজিদ থেকে বের হয়ে ধাওয়া করে কিংবা উত্তেজিত হয়ে মারধর করে।"
এছাড়া এমন ঘটনায় নানা মহলের সুযোগ নেয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
মি. রহমান বলেন, "দেখবেন, এসবের পেছনে অশুভ শক্তির হাত থাকে। অনেকে চায় একটা পরিস্থিতি তৈরি হোক, বিশৃঙ্খলা তৈরি হোক, সংঘাত তৈরি হোক।"
ইসলামী গবেষক ওয়ালীয়ুর রহমান ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যেসব মব হচ্ছে তার একটা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তবে এটাও স্পষ্ট যে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে ধর্মীয় নেতারা দেশব্যাপী নানারকম বক্তব্য-বয়ান প্রচার করেন। এসব বয়ানে নির্দিষ্ট কোনো মাজার, পীর বা ভিন্ন কোনো মতাদর্শকে অনৈসলামিক কিংবা ধর্মবিরোধী হিসেবে প্রচারের প্রবণতাও বহু পুরনো।
ইসলামী বক্তারা বা ধর্মীয় নেতারা একে 'ঈমানী দায়িত্ব' হিসেবেই প্রচার করে থাকেন।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সেই বয়ান থেকে সহিংসতা বা মবের সূত্রপাত যেন না হয় সে বিষয়ে সতর্কতা সেভাবে দেখা যায় না। ড. ওয়ালীয়ুর রহমানও অবশ্য এটা মানছেন।
তিনি বলেন, "ধর্মবিরোধী, ইসলাম বিরোধী কিংবা আল্লাহ-রাসূলের অবমাননাকর কাজ হয়তো কোথাও হচ্ছে। এসব বিষয়ে যখন ইমাম বা খতীব সাহেব আলোচনা করবেন তখন তার উচিত হবে এই আলোচনা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা। তবে পাশাপাশি এটাও বলা যে এদের বিচার বা এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা মুসল্লীরা নিতে পারবে না।"
তিনি বলেন, বয়ানে উল্লেখ করতে হবে যে আইন হাতে তুলে নেয়া যাবে না।
"বক্তা শ্রোতাদের বলবেন যে, তোমরা প্রতিবাদে মিছিল করতে পারবে, থানায় স্মারকলিপি দিতে পারবে, প্রয়োজনে মামলা করতে পারবে। কিন্তু নিজে গিয়ে ভাঙচুর করা, নিজে বিচার করে ফেলা, নিজেই কাউকে আক্রমণ করা -এটা শরীয়তেও নেই, প্রচলিত আইনেও নেই।"
'ব্যর্থতা স্বীকার করতে চাই' বললেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা
বাংলাদেশে একদিকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যেমন আইন হাতে তুলে নিতে দেখা যায়, তেমনই রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণেও মবের ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে। ফলে সামগ্রিকভাবেই দেশে মবের একটা বিস্তার ঘটেছে।
ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, মব যে থামছে না তার পেছনে আছে, তার ভাষায়, রাজনীতি।
তিনি বলেন, "গত দেড় বছরে মব নিয়ে মূলত: রাজনীতি করছে রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে দেখা যাচ্ছে মব নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর হতে পারেনি। দ্বিতীয়ত: হলো ইসলাম রক্ষার সাইনবোর্ড যেখানে আছে, সেখানেই রাজনৈতিক দল এবং সরকার হাত দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করছে না। কারণ হলো সকল দলই কমবেশি ধর্মকে রাজনীতির ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে।"
জোবাইদা নাসরীন বলছেন, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলেও মবের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়নি।
কিন্তু অতীতে মব নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমালোচনায় থাকা বিএনপি এখন কেন নিজেই মব নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে?
এমন প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান অবশ্য সরকারের ব্যর্থতা স্বীকার করেন।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা এটা স্বীকার করে নিতে প্রস্তুত যে, এধরনের ঘটনা না হতে দেয়া সরকারের অর্পিত দায়িত্ব ছিল। এবং সরকার এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এটা স্বীকার করতে চাই। আমাদের পদক্ষেপ নেয়া দরকার ছিল। আমরা সেটা নিতে শুরু করেছি।"
তিনি জানান, সরকার আইনের কঠোর প্রয়োগের দিকে এগুবে।
"একটা লেজিটিমেট বলপ্রয়োগের জন্য যা যা করা প্রয়োজন, সরকার সেটা অবশ্যই করবে। মবের ঘটনা ঠেকাতে সরকার কঠোর হবে।"