সিএনএন-সহ তিনটি সংবাদ মাধ্যমকে হোয়াইট হাউজে নিষিদ্ধ করলেন ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Getty Images

    • Author, বার্নড ডেবুসম্যান জুনিয়র
    • Role, হোয়াইট হাউজ সংবাদদাতা
    • Author, ম্যাক্স মাৎজা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

সিএনএন, এমএস নাউ এবং পলিটিকো– এই তিনটি সংবাদ মাধ্যমকে হোয়াইট হাউজে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা সংবাদমাধ্যমগুলোর সঙ্গে তার টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্কের সবশেষ মোড়।

শুক্রবার ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, এসব সংবাদমাধ্যম তার প্রশাসন সম্পর্কে "নিয়মিতভাবে কাল্পনিক তথ্য বা মিথ্যা" লিখে বা প্রচার করে। তবে তিনি এর কোনো উদাহরণ দেননি।

পরে ট্রাম্প এটিকে একটি "খুবই সহজ নিষেধাজ্ঞা" বলে উল্লেখ করেন, তবে এটি কীভাবে কার্যকর হবে সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দেননি।

এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের হোয়াইট হাউজ প্রাঙ্গণে প্রবেশে বাধা দেওয়া হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

সিএনএন দ্রুতই এ পদক্ষেপকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর একটি "অবৈধ আক্রমণ" বলে নিন্দা জানায়।

ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্প ডেস্কে বসে আছেন, তার পাশে কর্মকর্তারা এবং সামনে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ট্রাম্প এই ঘোষণা দেওয়ার পরপরই ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন

ঘোষণার অল্প সময় পরও পলিটিকো ও সিএনএন-এর সাংবাদিকরা হোয়াইট হাউজ প্রাঙ্গণে অবস্থান করছিলেন।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সিএনএনের একটি দল ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের সঙ্গে আইওয়ায় একটি অনুষ্ঠানে যাওয়া এবং সেখান থেকে ফেরার সফরেও ছিল।

এক বিবৃতিতে সিএনএন সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ বলে উল্লেখ করে এবং জানায়, তারা তাদের" হোয়াইট হাউজ টিম ও তাদের ন্যায্য ও নির্ভুল প্রতিবেদনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন" জানাচ্ছে।

সিএনএনের বিবৃতিতে বলা হয়, "মার্কিন সংবিধানের অধীনে আমরা কোনো বাধা বা সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়াই সেই প্রতিবেদন করার অধিকার রাখি।"

"প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন, তা কার্যকর হলে এটি হবে সেই মৌলিক ও সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত অধিকারের ওপর একটি অবৈধ আক্রমণ," বিবৃতিতে বলা হয়।

পলিটিকো-ও একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানায়, তারা হোয়াইট হাউজের বর্তমান কর্তৃপক্ষ এবং ভবিষ্যতের কর্তৃপক্ষগুলো নিয়েও "সুষ্ঠু প্রতিবেদন চালিয়ে যাবে"।

"সংবিধানের প্রথম সংশোধনীভিত্তিক অধিকার সীমিত করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা জোরালোভাবে লড়ব," বলেছে তারা।

এদকে, মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এমএস নাউ, যেটি আগে এমএসএনবিসি নামে পরিচিত ছিল।

ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছিলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, ট্রাম্প প্রশাসন বা যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে সংবাদ কভার করার সময় সংবাদমাধ্যমগুলো যেন নিয়মিতভাবে কাল্পনিক তথ্য ও মিথ্যা লিখতে বা প্রচার করতে না পারে। অন্য সংবাদমাধ্যমও তা অনুসরণ করবে।"

পোস্টে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিবেদন বা সংবাদ উল্লেখ করা হয়নি, যা এ পদক্ষেপের কারণ হতে পারে।

হোয়াইট হাউজ করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জ্যাকি হাইনরিখ বলেন, তারা তাদের সহকর্মীদের 'সমর্থনে' দাঁড়িয়েছেন, যাদের "কাজ করার কারণে আলাদাভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে"।

ফক্স নিউজ-এর কর্মী হাইনরিখ আরও বলেন, "এটি কেবল সাংবাদিকদের অধিকারের বিষয় নয়।এটি মার্কিন জনগণের অধিকার যে তারা দেশের সর্বোচ্চ পদে যিনি থাকুন না কেন, তার কার্যক্রম, নীতি ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন বিবরণ পাবে।"

পরে ওভাল অফিসে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, শুক্রবার বিকেলে এ ঘোষণা দেওয়ার জন্য কোনো 'বিশেষ কারণ' ছিল না।

তিনি বলেন, "গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলোর ফল এটি।"

"এতে আপনি বিরক্ত হয়ে যাবেন।"

নিষিদ্ধ সংবাদ মাধ্যমের তালিকা বাড়তে পারে জানিয়ে ট্রাম্প আরও বলেন, "আরও কেউ তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারে", তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমের নাম উল্লেখ করেননি।

তিনি স্বীকার করেন যে তার ঘোষণার বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। তিনি বলেন, "আমি মনে করি বিষয়টি তুলে ধরা ভালো, তা টিকে থাকুক বা না থাকুক।"

হোয়াইট হাউজের প্রেস অফিসে সিএনএন-এর একটি বুথ দেখা যাচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হোয়াইট হাউজের প্রেস অফিসে সিএনএন-এর একটি বুথ দেখা যাচ্ছে

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা বারবার হোয়াইট হাউজ প্রেস কোরের সদস্যদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছেন।

দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রেস কক্ষে রক্ষণশীল ব্লগার, ইনফ্লুয়েন্সার এবং অন্যান্য গণমাধ্যমকেও প্রবেশের সুযোগ দিয়েছেন। তার যুক্তি, মার্কিন জনগণকে বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গি দেওয়ার জন্য এটি প্রয়োজন।

ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউজ ঘোষণা করে যে ট্রাম্পের কাছে প্রবেশাধিকার থাকা প্রেস পুলের নিয়ন্ত্রণ তারা নিজের হাতে নেবে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এটি হোয়াইট হাউজ করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন পরিচালনা করে আসছিল।

একই মাসে প্রশাসন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের ওভাল অফিস বা এয়ার ফোর্স ওয়ানের মতো সীমিত প্রবেশাধিকারসম্পন্ন স্থানগুলো থেকে বাদ দেয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি 'গালফ অফ আমেরিকা' শব্দের পরিবর্তে 'গালফ অফ মেক্সিকো' ব্যবহার করছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস দ্রুত একটি মামলা দায়ের করে এবং মামলাটি এখনো চলমান।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই ওভাল অফিসে, এয়ার ফোর্স ওয়ানে এবং হোয়াইট হাউজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ান এবং প্রায়ই তাদের "ফেক নিউজ" ও "অভদ্র" বলে আখ্যা দেন।

তার প্রথম মেয়াদেও ট্রাম্প সিএনএনের সংবাদদাতা জিম অ্যাকোস্টাকে হোয়াইট হাউজ থেকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। তবে সিএনএন মামলা করার পর তার স্বীকৃতি পুনর্বহাল করা হয়।

সিএনএন যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র পাঁচটি সংবাদমাধ্যমের একটি, যারা প্রেস পুলের জন্য ভিডিও ধারণ করে।

প্রেস পুল বলতে বোঝায়, কোনো প্রেসিডেন্টে কোনো অনুষ্ঠানের উপকরণ একটি সংবাদমাধ্যম বা প্রতিবেদক অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নেয়।

বিবিসি হোয়াইট হাউজ রেডিও পুলে অবদান রাখে।

হোয়াইট হাউজ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হোয়াইট হাউজ

ঘোষণাটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা শীর্ষ কয়েকটি সংগঠন তাৎক্ষণিকভাবে সমালোচনা করে।

শুক্রবার বিকেলে কলাম্বিয়া ইউনিয়ার্সিটির নাইট ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট ইনস্টিটিউট এক বিবৃতিতে বলে, "ঠিক এই বিষয়েই এত আদালত তার বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার পরও মনে হতো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এত দিনে শিক্ষা নিয়েছেন।"

"যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব সংবাদসংস্থাকে হোয়াইট হাউজ প্রেস পুল থেকে বহিষ্কার করতে চান, তবে তার এ পদক্ষেপ দ্বিগুণভাবে অসাংবিধানিক। কারণ প্রথম সংশোধনীর অধীনে প্রেস পুল একটি 'পাবলিক ফোরাম', অর্থাৎ কোনো সাংবাদিককে তার মতামতের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট সেখান থেকে বাদ দিতে পারেন না," বলেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক জামিল জাফর।

সংবাদমাধ্যমকে আইনি সহায়তা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন রিপোর্টার্স কমিটি ফর ফ্রিডম অফ দ্য প্রেস জানায়, তারা আশা করছে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা দ্রুতই আদালতে বাতিল হবে, কারণ এটি "স্পষ্টতই অসাংবিধানিক"।

সংগঠনটির সভাপতি ব্রুস ব্রাউন বলেন, "প্রথম সংশোধনী পরিষ্কারভাবে বলে যে, হোয়াইট হাউজ একবার কিছু সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানালে, তাদের প্রতিবেদন পছন্দ নয় বলে অন্যদের নিষিদ্ধ করতে পারে না।"

তিনি সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞাকে "মতামতভিত্তিক বৈষম্যের পাঠ্যপুস্তকসুলভ উদাহরণ" বলে বর্ণনা করেন।

ওভাল অফিসে সাংবাদিকরা বুম মাইক্রোফোন ধরে আছেন, আর ট্রাম্প ও অন্যান্য কর্মকর্তারা তার ডেস্কের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

দ্য ফ্রিডম অফ দ্য প্রেস ফাউন্ডেশন-ও বলেছে যে এটি অবৈধ। তারা যোগ করেছে, "এর চেয়ে বেশি নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ পদক্ষেপ কল্পনা করাও কঠিন।"

সংগঠনটি বলেছে, ট্রাম্প "বহু বছর ধরে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণ করে আসছেন, কিন্তু তা তাকে সাহায্য করেনি" এবং "এসব চরম আক্রমণ কেবল দেখায় যে তিনি তথ্যসমৃদ্ধ জনগণকে কতটা ভয় পান"।

ট্রাম্প দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং বিবিসি-সহ যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন।

এসব মামলার কিছুতে সংবাদমাধ্যমগুলো বহু মিলিয়ন ডলারের সমঝোতা অর্থ দিতে সম্মত হয়েছে।

বিবিসি'র বিরুদ্ধে ট্রাম্পের মামলা এখনো চলমান।