জাতিসংঘের ভাষণে ইরানকে 'নিশ্চিহ্ন' করে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের

ছবির উৎস, Michael M. Santiago/Getty Images
- Author, বার্ন্ড ডেবুসম্যান জুনিয়র, খাশায়ার জোনিদি, সারাহ স্মিথ ও নাদা তৌফিক
- Reporting from, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, নিউইয়র্ক
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের ওপর পুনরায় হামলা চালাবেন নাকি শান্তি চুক্তির পথে এগোবেন- এ বিষয়ে তাকে একটি 'বড় সিদ্ধান্ত' নিতে হবে। সংঘাতের সমাধান না হলে ইরানকে 'নিশ্চিহ্ন' করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন ট্রাম্প।
এমন একটি সময় ট্রাম্প হুমকিটা দেন, যেদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তার ওই ভাষণের সময় ইরানের প্রতিনিধিদলের একজন সদস্যও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
কানায় কানায় পূর্ণ দর্শকের সামনে 'বৈশ্বিক সরকার' ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। সেইসঙ্গে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি স্থাপনে মধ্যস্থতা করার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের জয় নিশ্চিত করারও অঙ্গীকার করেন।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধ ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি নিজে এক ডজনেরও বেশি বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠক করছেন।
ট্রাম্প জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার ভাষণ শুরু করেন অর্থনীতি, অভিবাসন, সীমান্ত এবং সহিংস অপরাধ দমনে নিজের সাফল্য তুলে ধরে।
তখন হচ্ছিল যেন ম্যানহাটনের কূটনীতিকদের চেয়ে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটারদের লক্ষ্য করেই তিনি ভাষণটি দিচ্ছেন।
নিজের ভাষণের বেশিরভাগ সময় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ন্যায্যতা প্রমাণ করতেই ব্যয় করেছেন ট্রাম্প। গত ফেব্রুয়ারিতে ওই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমিয়ে দিয়েছে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

ছবির উৎস, EPA
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ট্রাম্পের ভাষণের সুর ছিল জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যের একেবারে বিপরীত। নিজের ভাষণে মি. গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, বিশ্বব্যাপী বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে। বিশ্ববাসীর 'পারস্পরিক নির্ভরশীলতার' ওপরেও জোর দেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুক্তি দিয়েছিলেন, চলমান সংঘাত তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রেখেছে। এটা তিনি 'শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা' বলে বর্ণনা করেন।
ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, "ইরানের সঙ্গে কি এমন কোনো চুক্তি হবে, যা তাদেরকে পুনর্গঠিত করে আগের চেয়ে অনেক উন্নত একটি দেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে?"
"নাকি আমি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন করে দেব এবং তা দ্রুত করব, যাতে তারা আর কখনো মানুষ ও কোনো দেশকে শেষ করে দেওয়ার সুযোগ না পায়? আমি কি তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব?," বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, নভেম্বরের নির্বাচনের পরপরই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হবে, যা এখন পর্যন্ত অধরাই রয়ে গেছে।
ইরানের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রেখেও ট্রাম্প যেভাবে শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিয়েছেন, সেটি তার পররাষ্ট্রনীতির জবরদস্তিমূলক কূটনৈতিক কৌশলেরই ইঙ্গিত বহন করে।
অধিবেশন শেষে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তিন ঘণ্টাব্যাপী চলা ওই বৈঠকটি 'অত্যন্ত ফলপ্রসূ' হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ছবির উৎস, Reuters
এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নিশ্চিত করেছে যে, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
যদিও সেখানে তারা কী নিয়ে আলোচনা করেছেন, সেবিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
বৈঠক শেষে জাতিসংঘ ভবন থেকে বের হওয়ার সময় মি. উইটকফের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে বিবিসি। বৈঠকটি কেমন হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি 'থাম্বস আপ' দেখিয়ে সেটির জবাব দেন।
পরবর্তীতে সামাজিক মাধ্যমের একটি বার্তায় উইটকফ নিশ্চিত করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনাটি হয়েছে মূলত 'মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে, যারা সারা দিন ধরে দু'পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন।"
"তারা সফলভাবে এক দফা আলোচনা সম্পন্ন করেছেন, যা গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক প্রমাণিত হবে বলে আমরা আশা করছি," সামাজিক মাধ্যম এক্সের একটি পোস্টে লিখেছেন উইটকফ।
"মধ্যস্থতাকারীরা তাদের কাজ চালিয়ে যাবেন," যোগ করেন ট্রাম্পের এই বিশেষ দূত।
ট্রাম্প তার ভাষণে আবারও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, তার কূটনীতি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান ঘটাবে।

ছবির উৎস, Reuters
যদিও যুদ্ধটি শেষ হওয়ার বিন্দুমাত্রা লক্ষণও এখনও দেখা যাচ্ছে না। বরং উভয় পক্ষই একে অপরের ভূখণ্ডে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে।
"রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতাদের সঙ্গে আমরা বিষয়টি নিয়ে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি এবং কাজটি সম্পন্ন করব," বলেন ট্রাম্প।
"আমার মনে হয়, সেটি মানুষের ধারণার চেয়েও দ্রুত ঘটবে," যোগ করেন তিনি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার নিউইয়র্কে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে দেখা করবেন।
অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সম্প্রতি মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সেটিকে মোটেও গুরুত্ব দেননি ট্রাম্প।
উল্টো বলেছেন, আতঙ্ক ছড়ানো বা প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের জন্য, তার ভাষায় 'বিশ্বায়নবাদী চক্রান্তের' কারণে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে নেতৃত্ব হারাবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুক্তি দিয়েছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বরং 'সুপার ইন্টেলিজেন্স' নামে পরিচিত করানো উচিত।
" 'কৃত্রিম' শব্দটির ব্যবহারে এটিকে ভুয়া মনে হয়। এটি ভুয়া নয়, বরং অসাধারণ। কিন্তু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে," বলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত মঙ্গলবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ট্রাম্প উত্তর আটলান্টিকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার জন্য ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন।
ওই চুক্তির ফলে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব পুনঃনিশ্চিত করবে। কিন্তু সেটার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বীপটির আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যাপকভিত্তিতে ব্যবহারের অনুমতি দিতে হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
এদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং ছাড়াও সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমানের নেতাদের সাথেও এদিন বৈঠক করেন ট্রাম্প।
বৈঠকের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেছেন, অন্যান্য আরব ও ইসলামী দেশগুলোর নেতাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বৈঠকে "বর্তমান আঞ্চলিক ঘটনাবলী, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা সুসংহত করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।"
এর আগে, গুতেরেস জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে তার বিদায়ী ভাষণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরাশক্তিগুলোকে এই বিষয়টি উপলব্ধি করার আহ্বান জানান যে, "তাদের শক্তি আসলে ততটাও পরাক্রমশালী নয়"।
ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা উল্লেখ করে গুতেরেস আরও বলেন, "বিশ্বে আমাদের বিভেদ রেখাগুলো আরও বড় হচ্ছে।"
এর জবাবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি জাতিসংঘকে এমন "বিশ্বায়নবাদী আমলাদের চরম-বামপন্থী এজেন্ডা" পরিচালনার জন্য অভিযুক্ত করেন, "যাদেরকে কেউ কখনো নির্বাচিত করেনি।"

ছবির উৎস, Getty Images
সেজন্য তাদের পরিবর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং 'অতুলনীয়' মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর বেশি জোর দিয়েছেন।
"বৈশ্বিক কোনো সরকার নেই," বলেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধের কোথাও কোনো হুমকিকে স্থায়ী হতে দেবে না বলেও সতর্ক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
"প্রয়োজন হলে, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত করতে আমরা আমাদের অতুলনীয় সামরিক শক্তি ব্যবহার করব," বলেন ট্রাম্প।
কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বামপন্থী গোষ্ঠী, যেমন- কমিউনিস্ট পার্টি ইউএসএ, অ্যান্টিফা এবং ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা'র অভিযোগ তুলেছেন ট্রাম্প।
কিউবাকে একটি "ব্যর্থ রাষ্ট্র" হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। কথাটি বলার পর ট্রাম্প জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উপস্থিত কিউবার প্রতিনিধিদের দিকে তাকান। এর প্রতিক্রিয়ায় কিউবার প্রতিনিধিদলটিকে সভাকক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে দেখা যায়।









