ভিএআর কী এবং বিশ্বকাপে এটি নিয়ে কেন এত বিতর্ক?

৭ই জুলাই ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ তৃতীয় গোল করার পর মিশরের মোহাম্মদ সালাহ (১০ নম্বর জার্সি পরিহিত) এবং তার সতীর্থরা রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরের কাছে প্রতিবাদ জানান। উজ্জ্বল হলুদ জার্সি পরা রেফারিকে সেখান থেকে হেঁটে চলে যেতে দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Reuters

    • Author, ফের্নান্দো দুয়ার্তে
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর ইতোমধ্যেই ফিফা ২০২৬ পুরুষ বিশ্বকাপে আলোচনার একটি বড় বিষয় ছিল। তবে ৭ই জুলাই মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার নাটকীয় শেষ ষোলোর জয়কে ঘিরে উত্তপ্ত বিতর্ক এটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

ম্যাচ শেষ হতে ১১ মিনিট বাকি থাকতে ২-০ গোলে এগিয়ে থাকা মিশর, লিওনেল মেসির নেতৃত্বে শেষদিকে আর্জেন্টিনার তিন গোলের প্রত্যাবর্তনের পর, একটি গোল বাতিল হওয়া এবং শেষ দিকে একটি পেনাল্টির দাবিতে ভিএআর হস্তক্ষেপ না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

খেলা শেষে মিশরের কোচ হোসাম হাসান বলেন, "হয়তো তারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের টুর্নামেন্টে রাখতে চেয়েছিল। হয়তো তারা চেয়েছিল মেসি লড়াইয়ে টিকে থাকুক।"

দ্বিতীয়ার্ধে মোস্তাফা জিকোর একটি গোল বাতিল করার সিদ্ধান্তে মিশরীয়রা বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ ছিল। তখন তারা ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল। আক্রমণের শুরুতে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ের ওপর মিডফিল্ডার মারওয়ান আতিয়া পা রেখেছিলেন বলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

তাদের দাবি ছিল, এর কয়েক সেকেন্ড পরই আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সে মোহাম্মদ সালাহ একই ধরনের ফাউলের শিকার হন। কিন্তু কোনো ফাউল দেওয়া হয়নি এবং এরপরই বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা জয়সূচক গোলের জন্য পাল্টা আক্রমণে যায়।

দুই ক্ষেত্রেই ভিএআরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

মায়ামি স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় ২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচে কলম্বিয়ার একটি গোল বাতিলের ভিএআর পর্যালোচনার বার্তা প্রদর্শিত হচ্ছে।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ২০২৬ বিশ্বকাপে ভিএআর-এর হস্তক্ষেপ একটি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে

ভিএআর কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) চালু করে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো একে রেফারিদের "আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে" সহায়তাকারী একটি মাধ্যম হিসেবে আখ্যা দেন।

সংক্ষেপে বললে, মাঠের রেফারিং দল কোনো ঘটনা দেখেননি বা দেখতে সক্ষম হননি এবং যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তে স্পষ্ট ভুল হয়েছে- এমন পরিস্থিতিতে ভিডিও প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের সহায়তা করাই এর উদ্দেশ্য।

এই প্রযুক্তি ম্যাচ রেফারিদের বিভিন্ন ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল থেকে ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনার সুযোগ দেয় এবং তারা বা তাদের দল তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ভুল করেছে কি না, তা নির্ধারণে সহায়তা করে।

ফিফার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ৩০০টিরও বেশি প্রতিযোগিতায় এটি ব্যবহৃত হয়েছে।

এক্ষেত্রে ম্যাচ কর্মকর্তাদের একটি দল মাঠের বাইরে ভিডিও অপারেশন কক্ষে বসে ফুটেজ বিশ্লেষণ করেন। ম্যাচ রেফারিদের মাঠের পাশে থাকা মনিটরে প্রাসঙ্গিক ফুটেজ দেখতে বলা হতে পারে।

এরপর মাঠের রেফারি সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।

২০২৬ বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে এসব কক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস শহরের একটি ব্রডকাস্টিং সেন্টারে স্থাপন করা হয়েছে।

সেনেগালের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচে ইরাকের রেবিন সুলাকাকে লাল কার্ড দেখানোর আগে টরন্টো স্টেডিয়ামে ভিএআর স্ক্রিন পরীক্ষা করছেন ব্রিটিশ রেফারি অ্যান্থনি টেইলর।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ভিএআর-এর সুপারিশগুলো যাচাই করার জন্য ম্যাচ রেফারিদের জন্য মাঠের পাশে একটি মনিটর থাকে

সব ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রেই কি এটি ব্যবহার করা যায়?

২০২৬ টুর্নামেন্টের আগে ভিএআর ব্যবস্থা কেবল চার ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা যেত– গোল, পেনাল্টি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, লাল কার্ডের ঘটনা এবং ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা।

ফিফা যেটিকে "স্পষ্টভাবে ভুলভাবে দেওয়া কর্নার কিক" হিসেবে বর্ণনা করে, সেই পঞ্চম বিষয়টি তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় হলুদ কার্ড থেকে লাল কার্ড প্রদর্শনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ভুল হলেও এখন ভিএআর ব্যবহার করা হয়।

বল গোললাইন অতিক্রম করেছে কি না, তা নির্ধারণে ভিএআরের কোনো ভূমিকা নেই।

এটি অন্য একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়, যেখানে ম্যাচ বলের মধ্যে থাকা একটি চিপ সরাসরি রেফারিদের স্মার্টওয়াচে তথ্য পাঠায়।

কতদিন ধরে ব্যবহার হচ্ছে এবং এটি কি সিদ্ধান্ত বদলে দেয়?

২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে মস্কোয় ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার ম্যাচে ভিএআরের মাধ্যমে চিহ্নিত একটি ঘটনা পর্যালোচনা করে ফ্রান্সকে পেনাল্টি দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন রেফারি নেস্তর পিতানা। নীল জার্সি পরিহিত ফরাসি স্ট্রাইকার অলিভিয়ে জিরুকে হাত উঁচিয়ে উদ্‌যাপন করতে দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলে ভিএআর-এর অভিষেক ঘটে এবং ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার ফাইনালে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে

রাশিয়ায় ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলে ভিএআরের অভিষেক হয় এবং ৬৪ ম্যাচে এটি ২০ বার হস্তক্ষেপ করে।

এতে ১৭টি রেফারিং সিদ্ধান্ত বদলে যায়, যার মধ্যে ফাইনালের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও ছিল। তখন ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়া ১-১ সমতায় ছিল। ভিএআরের কারণে ম্যাচ রেফারি বক্সের বাইরে হ্যান্ডবলের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পেনাল্টি দেন।

ফ্রান্স সেই পেনাল্টি থেকে গোল করে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলে ম্যাচ জিতে নেয়।

চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপে ভিএআর ২৭ বার হস্তক্ষেপ করে।

মাঠের পাশের মনিটরে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হলে, দুইটি ঘটনা ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রেই রেফারিরা তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

বর্তমান টুর্নামেন্টে কী ঘটছে?

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে নরওয়ের ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আয়ারের ফাউলের শিকার হচ্ছেন ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড মাতেউস কুনিয়া (হলুদ জার্সিতে ৯ নম্বর)।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, এই বিশ্বকাপে ভিএআর-এর কারণে অনেক সিদ্ধান্ত পাল্টে গেছে, যেমন শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলকে পেনাল্টি দেওয়া
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বর্তমান টুর্নামেন্ট এখনো চলমান থাকায় পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

তবে বিবিসি স্পোর্টের ফুটবল বিষয়ক প্রতিবেদক ও ভিএআর বিশেষজ্ঞ ডেইল জনসনের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সম্প্রসারিত এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ৯৬ ম্যাচে (মোট ম্যাচ হবে ১০৪টি) রেফারিরা ২৩ বার মাঠের পাশের মনিটরে গেছেন। অর্থাৎ আগের বিশ্বকাপের তুলনায় ম্যাচপ্রতি কমবার।

মাত্র একটি ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের পরও মূল সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসেনি।

জনসন ব্যাখ্যা করেন, "মাত্র গত সপ্তাহেই ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়ারলুইজি কলিনা তার কর্মকর্তাদের দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার কথা তুলে ধরেছেন।"

"রেফারিদের বলা হয়েছে, স্বাভাবিক ফুটবলীয় সংস্পর্শকে খেলার অংশ হিসেবে মেনে নিতে, যাতে ম্যাচের গতি বাড়ে।"

এই বিশেষজ্ঞের মতে, এর ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে ফাউলের গড় সংখ্যা (২২.৬) আগের দুই আসরের তুলনায় কম। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৫ এবং ২০১৮ সালে ছিল ২৭।

জনসন বলেন, মিশরের গোল বাতিল করার ক্ষেত্রে ভিএআরের সিদ্ধান্ত টুর্নামেন্টজুড়ে রেফারিংয়ের ধারা অনুযায়ী "অসংগতিপূর্ণ" ছিল।

"আপনি যদি মাঠে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ চলতে দেন, তাহলে ভিএআরের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।"

তিনি উপসংহারে বলেন, "আমার মনে হয় বিষয়টি আরও অসংগতিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং ভিএআর কী সিদ্ধান্ত দেবে তা অনুমান করা আরও কঠিন হয়ে গেছে।"

তবে সালাহর ঘটনাকে জনসন বিশেষ বিতর্কিত বলে মনে করেননি।

তিনি বলেন, "সালাহ পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ছিলেন। তাই ভিএআর সম্ভাব্য পেনাল্টি যাচাই করছিল, যেখানে ফাউল প্রমাণের মানদণ্ড আরও কঠোর।"