মাসিকের ব্যথার সাথে কি বয়সের সম্পর্ক আছে?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, তারহাব আসগর
- Role, বিবিসি উর্দু, লাহোর
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
'আমার বয়স পঁয়ত্রিশ। গত কয়েকদিন ধরে মাসিকের সময় আমার পেটে এবং তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিল। আগে এরকম ছিল না এবং এত তীব্র ব্যথা আমার কখনো হয়নি।'
কথাগুলো বলেছিলেন আমনা আলী নামে এক নারী, যিনি বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জননী।
তিনি বলেন, 'বিয়ের পর আমি চারবার গর্ভবতী হয়েছি। আমার দুটি গর্ভপাত হয়েছিল এবং ওই সময়ে আমার ডিএনসিও হয়েছিল।'
ডায়লেশন অ্যান্ড কিউরাটেজ বা ডিএনসি হল এমন এক ধরণের সার্জিক্যাল পদ্ধতি যার মাধ্যমে জরায়ু, সারভিক্স এবং গর্ভাশয় পরীক্ষা করা হয়।
'আমি ভেবেছিলাম ডিএনসির পর আমার শরীরে কোনও সমস্যার কারণে পিরিয়ডের সময় এতো তীব্র ব্যথা হচ্ছে।
ব্যথার কারণ জানতে আমি নানা ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং আলট্রাসাউন্ড করিয়েছি, কিন্তু সব রিপোর্টে ভালো ফল এসেছে। একটা লম্বা সময় পর্যন্ত আমি জানতেই পারিনি কেন আমার মাসিকের এতোটা তীব্র ব্যথা হচ্ছে।
নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে আমনা বলেন, 'মাসিকের প্রথম তিন দিন আমার এতো বেশি ব্যথা হয় যে তা সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই মাঝে মাঝে ব্যথানাশক ওষুধ খাই।
আমনা বলেন, পরিবারের বয়স্ক নারীরা তাকে বলেছেন যে, একজন নারীর বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়তে থাকে, 'কিন্তু আমি মনে করি আমার এতোটাও বয়স হয়নি।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আমনাই একমাত্র নারী নন - যিনি বয়সের সাথে সাথে মাসিকের ব্যথা বা পিরিয়ড ক্র্যাম্প বাড়ার এমন অভিযোগ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীরাও এই অভিযোগ জানিয়েছেন।
এক্স ব্যবহারকারী জোয়া রহমান লিখেছেন, "৩০ বছর বয়সের পর, আমার মাসিকের ব্যথা আরও বেড়ে গিয়েছে, বিশেষ করে গত কয়েক মাসে। আজ আমি চিৎকার করে জেগে উঠেছি, কারণ স্বাভাবিক ব্যথা ছাড়াও আমার পায়ের গোড়ালি ও পায়ের পাতা একদম ফুলে গিয়েছে। অন্য নারীদের ক্ষেত্রেও কি এমনটা হয়?"
জোয়ার স্বাস্থ্য সমস্যার সাথে নিজের পরিস্থিতি তুলনা করেছেন মুনিল আলী বলেছেন, "হ্যাঁ, আমার বাহুও অসাড় হয়ে যায় এবং মনে হয় তাতে কোন প্রাণ নেই। আমি আলট্রাসাউন্ড করার কথা ভাবছি।"
একইভাবে ফাতিমা ইয়ামিন বলেন, "বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটা হতে পারে। ২০ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত আমি কোন ব্যথা অনুভব করিনি। তবে ৩০ বছর বয়সের পরে মাসিক আমার জন্য একটি যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা হয়ে উঠেছে।"
এই বিষয়ে কিছু নারী তাদের মতামত জানিয়ে বলেছেন, মাসিকের সময় প্রচণ্ড ব্যথা হওয়ার কারণ হিসেবে তারা বয়স বাড়ার পাশাপাশি আগে করোনায় আক্রান্ত হওয়াকে দায়ী করছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হল, মাসিকের ব্যথার সঙ্গে বয়স বাড়ার কোনও সম্পর্ক আছে কি না এবং এর সঙ্গে করোনা ভাইরাসেরও কোনও সম্পর্ক আছে কী না?

ছবির উৎস, Getty Images
মাসিকের ব্যথার সাথে বয়সের সম্পর্ক আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর জানতে বিবিসি অনেক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছে।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মিসবাহ মালিকের মতে, এ বিষয়ে যে গবেষণা হয়েছে সেখানে প্রমাণ হয়নি যে বয়স বাড়ার সাথে সাথে মাসিকের ব্যথা বাড়ার কোনও সম্পর্ক আছে।
"অনেক নারী আছেন যারা ৩০ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই তাদের মাসিকে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। কিন্তু তারপরে ব্যথার তীব্রতা সময়ের সাথে সাথে কমে যায়। এমন কিছু নারীও আছেন যাদের ৩০ বছর বয়সে মাসিকের ব্যথা শুরু হয়। এই ব্যথা বয়সের সাথে বাড়তে থাকে।"
ডা. মিসবাহ আরও বলেন, বয়স এক্ষেত্রে যে ভূমিকা পালন করে সেটি হলো, বেশিরভাগ নারীর বয়স ৩০ বছর হওয়ার আগেই তাদের বিয়ে হয়ে যায়, আবার অনেক নারী এই বয়সে পৌঁছানোর আগেই মা হয়ে যান।
বিয়ে এবং মাতৃত্ব নারীদের শরীরে পরিবর্তন আনে।
এমন আরও অনেক কারণ রয়েছে, যা ভয়াবহ মাসিক ক্র্যাম্পের কারণ হতে পারে। যেমন পলিসিস্টিক ওভারিজ (ডিম্বাশয়ে সিস্ট), এন্ডোমেট্রিওসিস বা জরায়ুর চারপাশে ফাইব্রয়েড গঠন।
ডা. মিসবাহের মতে, এর আরও অনেক কারণ থাকতে পারে, যেমন নারীদের ওজন বেড়ে যাওয়া বা সন্তান প্রসবের পর নিজের প্রতি অযত্ন ও জীবনযাপনে পরিবর্তনের কারণেও মাসিকের তীব্র ব্যথা হতে পারে।

ছবির উৎস, Getty Images
মাসিকের ব্যথার তীব্রতার সাথে কি করোনার সম্পর্ক আছে?
মাসিকের ব্যথার তীব্রতার সাথে কি করোনার কোনও সম্পর্ক আছে?
এ প্রশ্নের জবাবে ড. মিসবাহ বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া এবং মাসিকের সময় ব্যথা বাড়ার মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই এবং এ ধরনের কোনও গবেষণা এখনও প্রকাশ হয়নি
ডা. শাহিনা আসিফও একই মত প্রকাশ করে বলেন, মাসিকের ব্যথার সঙ্গে বয়সের কোনও বিশেষ সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেছেন, মাসিকের ব্যথার তীব্রতার অনেক কারণ থাকতে পারে, যা আপনার মধ্যে ইতিমধ্যে বিদ্যমান থাকতে পারে এবং সময়ের সাথে সাথে সেই সমস্যা বিকাশের লাভ করে এখন যন্ত্রণা দিতে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, এটা নিশ্চিত যে বয়সের সাথে সাথে নারীর জরায়ুর আকারও বাড়ে, যার কারণে আগে থেকে থাকা সমস্যাগুলোও আপনার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
ডা. শাহিনা বিশ্বাস করেন যে 'এই ব্যথা একজন নারীর শরীরের পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে, তবে বয়সের সাথে সম্পর্কিত নয়।'
তিনি বলেন, নারীরা মাসিকের সময় ব্যথা নিয়ে যতটা অভিযোগ করেন তার চাইতেও বেশি অভিযোগ করেন হাত-পা অসাড় হয়ে যাওয়া নিয়ে, এর কারণ হল মাসিকের সময় হাড়ের ক্ষয় হয়, যা শরীরকে দুর্বল করে তোলে।
ডা. শাহিনা পরামর্শ দেন যে মাসিকের দিনগুলোতে নারীদের জন্য খুব জরুরি তাদের খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার বিশেষ যত্ন নেওয়া।

ছবির উৎস, Getty Images
মাসিকের সময় ব্যথা অনুভব করেন কেন?
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির নাফিল্ড ডিপার্টমেন্ট অফ উইমেন রিপ্রোডাক্টিভ হেলথের ড. কেটি ভিনসেন্ট পিরিয়ড পেইন নিয়ে গবেষণা করছেন।
তিনি বিবিসিকে বলেন, "৩০ থেকে ৫০ শতাংশ নারী মাসিকের ব্যথায় ভোগেন। যখন নারীদের মাসিক হয়, তখন জরায়ু সংকুচিত হয়ে রক্ত বের হতে দেয়।"
"এই সময়ে রক্ত জমাট বাধার কারণে মাথা ঘোরায়। প্রকৃতপক্ষে জরায়ুর মুখ খোলার ফলে জমাট বাঁধা রক্ত বেরিয়ে যেতে পারে, এতে আরও সংকোচন ঘটে।"
মাসিকের সময় ফুলে যাওয়ার সমস্যাও দেখা দেয়।
জরায়ুর টিস্যু এমন একটি রাসায়নিক নির্গত করে যা ব্যথা বাড়ায় এবং শরীর প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নির্গত করে, এটি এমন এক রাসায়নিক যা মাসিক চক্রের সময় বৃদ্ধি পায়।
প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন আসলে এক ধরণের ফ্যাটি যৌগ যা কোষে তৈরি হয় এবং শরীরের বিভিন্ন ধরনের কাজ করে।
উদাহরণস্বরূপ, মাসিকের সময়, এটি জরায়ুর প্রাচীরের সংকোচন ঘটায় এবং এটি প্রতিক্রিয়াশীল প্রদাহ সৃষ্টি করে যার কারণে ব্যথা হয়।
প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন কোন হরমোন নয়, তবে তারা হরমোনের অনুরূপ।
এ নিয়ে ডা. ভিনসেন্ট বলেছেন, “আমরা মনে করি যে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন আসলে মাসিকের সময় প্রদাহ এবং ব্যথা বৃদ্ধি করতে পারে,”

ছবির উৎস, Getty Images
মাসিকের ব্যথা নিয়ে আপনার কখন চিন্তা করা উচিত?
মাসিকের সময় ব্যথা হওয়া নারীদের সাধারণত অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এবং ব্যথা-উপশমকারী ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।
অনেক সময় আগে থেকে বিদ্যমান স্বাস্থ্য সমস্যার কারণেও মাসিকের ব্যথা হয়। এ ব্যাধিগুলোর মধ্যে একটি জরায়ু ফাইব্রয়েড নামে পরিচিত, যাকে ফাইব্রয়েডও বলা হয়।
এসব ফাইব্রয়েড ক্যান্সারবিহীন, যা জরায়ুতে এবং তার চারপাশে বৃদ্ধি পায় এবং মাসিকের ব্যথার কারণ হয়।
মাসিকের সময় পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ-পিআইডি এর কারণে গুরুতর ব্যথা হতে পারে। যা জরায়ু, ফ্যালোপিয়ান টিউব এবং ডিম্বাশয়ের সংক্রমণের কারণেও হয়ে থাকে।
পিআইডি প্রায়ই ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয় যা যৌন মিলনের সময় ছড়াতে পারে, যেমন ক্ল্যামাইডিয়া বা গনোরিয়া। এই দুটি সংক্রমণ আছে এমন কারো সাথে যৌন মিলন করলে পিআইডি হতে পারে।
মাসিকের ক্র্যাম্পগুলো প্রায়শই ইনট্রটারিন ডিভাইসের কারণেও হতে পারে, যা সাধারণত গর্ভনিরোধের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং গর্ভাবস্থা রোধ করার জন্য জরায়ুতে ঢোকানো হয়।
ইউএস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথের মতে, বেদনাদায়ক মাসিকের সম্ভাব্য অন্যান্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে:
- এন্ডোমেট্রিওসিস।
- ইনট্রটারিন ডিভাইস (আইইউডি) যা গর্ভনিরোধের জন্য ব্যবহৃত হয়।
- পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (পিআইডি) যা যৌন মিলনের সময় ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ।
- প্রি মেন্সট্রুয়াল সিন্ড্রোম (পিএমএস) অর্থাৎ মাসিক হওয়ার কয়েকদিন আগে থেকে কিছু সমস্যা।
- সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ইনফেকশন (এসটিআই) যা যৌন মিলনের সময় সংক্রমণ ঘটায়।
মাসিকের ব্যথার বিষয়ে চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন যে নারীরা যেন তাদের জীবনযাত্রার উন্নতির পাশাপাশি তাদের চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করে। ব্যথার সম্ভাব্য কারণ বের করে, সেটা সমাধানের বিষয়ে সচেতন হয়।







