আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই পুলিশের মৃত্যুদণ্ড, বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা

ছবির উৎস, SHARIER MIM
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় নিহত শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। বাকি আসামিদের যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম ও বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ১৬ই জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ।
আবু সাঈদের হত্যার ঘটনাকে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম 'টার্নিং পয়েন্ট' মনে করা হয়।
বৃহস্পতিবার দেয়া রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুই আসামি হলেন পুলিশের এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।
এছাড়া সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন, এসআই বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধবকর যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
মামলার আসামি রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য হাসিবুর রশীদ, গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল এবং রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন কমিশনার মনিরুজ্জামানকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় পড়া শুরু করে করে।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন - বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মামলার রায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

ছবির উৎস, Screengrab
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
রায়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকেও ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল ও সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফানকে পাঁচ ও তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশকে পলাশ দেয়া হয়েছে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহসভাপতি ফজলে রাব্বী, সহসভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ এবং ধনঞ্জয় কুমারকে দোষী সাব্যস্তক্রমে তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশকে দেয়া হয়েছে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদকে দেয়া হয়েছে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয় এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল, সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমানকে দেয়া হয়েছে তিন বছর করে এবং এমএলএসএস একেএম আমির হোসেনকে দেয়া হয়েছে তিন বছরের কারাদণ্ড।
রংপুর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেনকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।
এছাড়া তৎকালীন উপপুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ও অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারীকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
রায়ে মামলার ২৯ নং আসামি প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজের হাজতবাস কালীন সময়কে কারাবাস ধরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং সাজর মেয়াদ পূর্ণ ধরে তাকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

রায়ের প্রতিক্রিয়া
আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন নিহত শিক্ষার্থীর বাবা মকবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা বেগম।
রায়ের পরপরই দুপুরে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর এলাকার জাফর পাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে এই প্রতিক্রিয়া জানান তারা।
আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, "আরও লোকের ফাঁসি হওয়া দরকার ছিল"।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পর তারা সিদ্ধান্ত নেবেন কোনো আপিল করা হবে কি না।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, তিনি দায়িত্ব নেয়ার আগেই এই মামলার তদন্ত ও বিচারকার্য শেষ হয়েছে। মামলায় মোট ২৫ জনের সাক্ষী নেয়া হয়েছে এবং রায়ে আসামি থাকা ৩০ জনকেই দণ্ডিত করা হয়েছে।
তিন আসামির বিরুদ্ধে একাধিক চার্জ প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদের ক্ষেত্রে যেসব অভিযোগে খালাস দেয়া হয়েছে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়ার পর প্রয়োজন মনে হলে রায় রিভিউ করার আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি।
একইসাথে 'সুপারিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি'র কথা মাথায় রেখে আগেই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে যে রায় এসেছিল, একে তার সাথে মিলিয়ে দেখার সুযোগ আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা
২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন ১৬ই জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ।
দুই হাত ছড়িয়ে পুলিশের সামনে দাঁড়ানো আবু সাঈদের একটি ভিডিও সেসময় সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়। তার মৃত্যুতে সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার এক পর্যায়ে কারফিউ জারি করলেও তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় সরকার।
তার ২০ দিন পর ২০২৫ সালের পাঁচই অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পতন হয়।
এরপর জুলাই আন্দোলনের সময় হওয়া সহিংসতা ও দমন-পীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
মামলা কবে
২০২৫ সালের ২৪শে জুন ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে জমা দেয়া তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে আবু সাঈদ হত্যার সঙ্গে ৩০ জনের সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে আসে।
এরমধ্যে ছয়জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ বাকি ২৪ জন আসামি পলাতক ছিলেন।
ছয়দিন পর ৩০ জুন অভিযোগ আমলে নেয়া হয়। পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয় পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে।
পলাতক থাকা ২৪ জন আসামির জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চারজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের ছয়ই অগাস্ট ৩০জন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার বিচারকাজ শুরু হয়।
চলতি বছরের ২১শে জানুয়ারি থেকে ২৫শে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রসিকিউশন এবং ২৭শে জানুয়ারি আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।








