ঘুমের সময় সঙ্গীর নাক ডাকা যেভাবে আপনার স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে

সবুজ রঙের দেয়াল ও কাঠের খাটের ফ্রেমের সামনে বিছানায় শুয়ে থাকা এক নারী, যিনি শব্দ ঠেকাতে কানের ওপর বালিশ চেপে ধরেছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

    • Author, এলা কিপলিং
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

আপনি কি কখনও এমন কোনো সঙ্গীর পাশে ঘুমিয়েছেন যিনি নাক ডাকেন এবং পরদিন ঘুম থেকে উঠে নিজেকে চাপগ্রস্ত, অমনোযোগী বা ভুলোমনা মনে হয়েছে?

নাক ডাকা তুলনামূলকভাবে সাধারণ হওয়ায় এটি প্রায়ই চিকিৎসাবিহীন থেকে যায় এবং নিরীহ বিরক্তি হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, নাক ডাকা কারও পাশে ঘুমানো আপনার স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

ডেন্টাল স্লিপ মেডিসিনে বিশেষ আগ্রহী দন্তচিকিৎসক ডা. ক্লেয়ার সাইমন ব্যাখ্যা করেন, ঘুমের সময় আমাদের ঊর্ধ্ব শ্বাসনালির নরম টিস্যুগুলোর কম্পনের কারণে নাক ডাকার শব্দ হয়।

ব্রিটিশ স্নোরিং অ্যান্ড স্লিপ অ্যাপনিয়া অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএসএএ) বলছে, যুক্তরাজ্যের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ নাক ডাকেন এবং এ সমস্যা নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

আর স্লিপ ফাউন্ডেশনের এক মার্কিন জরিপ অনুযায়ী, যাদের সঙ্গী নাক ডাকেন তাদের ৭৫ শতাংশ বলেছেন যে এতে তাদের ঘুমের ওপর প্রভাব পড়েছে।

সঙ্গীদের ওপর এর প্রভাব এবং এ বিষয়ে কী করা যেতে পারে, সে সম্পর্কে যা জানা প্রয়োজন তা এখানে তুলে ধরা হলো।

মনোযোগ ও স্মৃতি

অ্যারোক্স হেলথের পরামর্শক অর্থোডন্টিস্ট ও ঘুমবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আমা জোহাল বলেন, নাক ডাকা ব্যক্তির সঙ্গীর ওপর এর প্রভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যে, ঘুমানোর প্রয়োজনীয়তার কারণে তারা শেষ পর্যন্ত উঠে অন্য ঘরে গিয়ে ঘুমাতে বাধ্য হন।

তিনি যোগ করেন, "মানুষ হিসেবে ঘুমের এই প্রয়োজন পূরণ ছাড়া আমরা শারীরিকভাবে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারি না।"

গাঢ় ধূসর রঙের ছোট করে কাটা চুলের একজন পুরুষ, অধ্যাপক আমা জোহাল, ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। তিনি নেভি রঙের কলারযুক্ত পোলো শার্ট পরেছেন এবং পেছনের দৃশ্য ঝাপসা।

ছবির উৎস, Professor Ama Johal

ছবির ক্যাপশান, অধ্যাপক আমা জোহাল বলেন, অনেক দম্পতি নাক ডাকার নেতিবাচক প্রভাব খুব দীর্ঘ সময় ধরে সহ্য করেন

রাতের ঘুমের সময় আমরা বিভিন্ন ধাপের মধ্য দিয়ে বারবার চক্রাকারে অতিক্রম করি, যা সাধারণত প্রতি ৯০ মিনিট পরপর পুনরাবৃত্তি হয়।

এই চক্রের গভীর ঘুমের ধাপগুলো শারীরিক পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিএসএসএএ ব্যাখ্যা করছে, যদি ঘুম বারবার ব্যাহত হয়, তবে আপনি পুনরুদ্ধারমূলক ধাপগুলোতে কম সময় কাটাতে পারেন। ফলে বিছানায় অনেক সময় কাটালেও ঘুম থেকে উঠে ক্লান্ত লাগতে পারে।

ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের তথ্য প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করে।

নাক ডাকা সঙ্গীর কারণে ঘন ঘন ঘুম ভাঙলে খণ্ডিত ঘুম হতে পারে, যা এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং আপনার মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে।

ঘুম ব্যাহত হলে তা হরমোন নিয়ন্ত্রণেও প্রভাব ফেলতে পারে, যা আপনার শক্তির মাত্রা ও প্রেরণাকে প্রভাবিত করে।

Skip বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন: and continue readingবিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

একজন পুরুষ ঘুমাচ্ছেন, পাশে বালিশ দিয়ে কান চাপা দিয়ে তাকিয়ে শুয়ে আছেন একজন নারী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গবেষণার ফল বলছে, ঘুমের সময় নাক ডাকার এ সমস্যা নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ঘুম মস্তিষ্কের সেই ব্যবস্থাগুলো নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে, যেগুলো চাপ ও আবেগগত প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

ঘুম ব্যাহত হলে এসব ব্যবস্থার ভারসাম্য কমে যেতে পারে, যার ফলে আপনি বেশি খিটখিটে বোধ করতে পারেন এবং চাপ সামলানোর সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

২৯ বছর বয়সী মেগ ওয়ারেন তার সাবেক সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে ঘন ঘন জেগে উঠতেন।

তিনি বলেন, "প্রতিবারই নাক ডাকার কারণে ঘুম ভাঙার পর নিজেকে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থায় অনুভব করতাম।"

একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মিডিয়া কর্মকর্তা মেগ রাতজুড়ে তাকে ধাক্কা দিতেন এবং চিৎ হয়ে শোয়া থেকে কাত হয়ে শোয়ার জন্য উৎসাহিত করতেন।

তিনি বলেন, "ঘুম থেকে উঠে ঝিমঝিম ও দিশেহারা লাগত, কখনও কখনও এতটাই যে মনে হতো যেন হ্যাংওভার হয়েছে।"

নাক ডাকার বিষয়টি তাদের সম্পর্কের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছিল।

"আমি সব সময়ই বলতাম, আমরা যদি একসঙ্গে থাকতাম, তাহলে অসহনীয় নাক ডাকার রাতগুলোর জন্য একটি আলাদা শোবার ঘর রাখতে হতো," বলেন মেগ।

ডাক্তার ক্লেয়ার সাইমন বলেন, সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে ভাঙা ঘুম খিটখিটে মেজাজ, ঝগড়া এবং আলাদা ঘরে ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ঘনিষ্ঠতা কমিয়ে দিতে পারে।

সোনালি চুলের এক তরুণী মেগ ওয়ারেন একটি ঝোপের সামনে দাঁড়িয়ে হাসছেন। তিনি চিতাবাঘের ছাপযুক্ত একটি পোশাক পরেছেন।

ছবির উৎস, Meg Warren

ছবির ক্যাপশান, সাবেক সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া রাতের পর মেগ ওয়ারেনের 'ঝিমঝিম ও দিশেহারা' লাগত

৫২ বছর বয়সী সাংবাদিক আনা-লুইজ ডিয়ার্ডেন বলেন, সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে তিনি কখনও কখনও আলাদা ঘরে ঘুমান।

সঙ্গীর নাক ডাকা বিশেষভাবে খারাপ হলে তিনি নিজের পর্যাপ্ত বিশ্রামকে অগ্রাধিকার দিতে এটা করেন।

আনা-লুইজ ডিয়ার্ডেন একটি বার স্টুলে বসে আছেন। তিনি লাইম সবুজ রঙের পোশাক পরেছেন এবং ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছেন

ছবির উৎস, Anna-Louise Dearden

ছবির ক্যাপশান, আনা-লুইজ ডিয়ার্ডেন বলেন, তার সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে কখনও কখনও তাকে অন্য ঘরে ঘুমাতে হয়েছে

"আপনি যদি ঘুম থেকে উঠে দেখেন যে আপনার রাতটা খারাপ গেছে, তাহলে আপনি বেশি খাবার খান এবং আরও খিটখিটে অনুভব করেন," বলেন আনা-লুইজ।

আগে নাক ডাকার কারণে রাতে প্রায়ই তার ঘুম ভেঙে যেত।

তবে তিনি দেখেছেন, ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করা "জীবন রক্ষাকারীর মতো", কারণ সঙ্গীর সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমানোর সময় এটি তাকে বেশিরভাগ শব্দ উপেক্ষা করে ঘুমিয়ে থাকতে সাহায্য করে।

কখন সাহায্য নেওয়া উচিত?

সাইমন ও জোহাল দুজনেই বলেন, এ বিষয়ে কিছু করা সম্ভব।

তবে প্রথমে বোঝা জরুরি, আপনার সঙ্গী কি শুধু নাক ডাকছেন, নাকি তার স্লিপ অ্যাপনিয়া রয়েছে।

"আপনি কখনই এমন কিছু করতে চাইবেন না যাতে কাউকে শুধু রাতের বেলা কম শব্দ করতে সাহায্য করা হয়, অথচ সম্ভাব্য কোনো ঘুম-সংশ্লিষ্ট শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত অন্তর্নিহিত সমস্যা নজর এড়িয়ে যায়," বলেন সাইমন।

স্লিপ অ্যাপনিয়া এমন একটি সমস্যা, যাতে ঘুমের সময় একজন মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস বারবার বন্ধ হয়ে আবার শুরু হয়।

এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, রাতে হাঁসফাঁস করা, ঘন ঘন ঘুম ভাঙা এবং সকালে মাথাব্যথা হওয়া।

সাইমন ব্যাখ্যা করেন, যদি বিষয়টি এমন হয়, তাহলে আপনাকে কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার (সিপিএপি) মেশিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে, অথবা কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারেরও প্রয়োজন হতে পারে।

সাধারণ নাক ডাকার ক্ষেত্রে সাইমন বলেন, জীবনযাপনে পরিবর্তন আনলে উপকার হতে পারে।

যেমন ওজন কমানো, ধূমপান বন্ধ করা, ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল গ্রহণ কমানো, অথবা ঘুমানোর ভঙ্গি পরিবর্তন করা, যেমন চিৎ হয়ে শোয়া বদলে কাত হয়ে শোয়া।

আপনি আপনার সঙ্গীকে একজন চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করার পরামর্শও দিতে পারেন, যিনি প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারবেন বা বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে পারবেন।

কোনো বিশেষজ্ঞ নাক ডাকার কারণ যদি নাকের বাধা বা অ্যালার্জি হয়, তাহলে তার চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন। অথবা নিম্ন চোয়ালকে সামান্য সামনে এনে শ্বাসনালি খোলা রাখতে বিশেষভাবে তৈরি একটি মাউথগার্ড ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন।

জোহাল বলেন, অনেক দম্পতি "অত্যন্ত দীর্ঘ সময়" ধরে নাক ডাকার সমস্যা সহ্য করেন, যা তাদের সম্পর্ক ও সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলে।

তিনি বলেন, "মূল বিষয় হলো, এর জন্য যেখানে সহায়তা পাওয়া যায়, শুধু সেখানে পৌঁছাতে হবে।"