জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তথ্যচিত্র নিয়ে দিনে হট্টগোল ও রাতে সরকারের দুঃখ প্রকাশ

হাফিজ উদ্দিন আহমেদ

ছবির উৎস, facebook.com/majhafizuddin.ahmed.9

ছবির ক্যাপশান, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত থাকার সময়ই অনুষ্ঠানে হট্টগোল হয়েছে
Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির সরকারি এক অনুষ্ঠানে একটি তথ্যচিত্র ঘিরে তুমুল হট্টগোল হয় যেখানে উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। পরে রাতে 'দুঃখ প্রকাশ' করে অনুষ্ঠানটির আয়োজক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

বুধবারের ওই অনুষ্ঠানে প্রচারিত তথ্যচিত্রে 'ইতিহাস বিকৃতির' অভিযোগ তোলেন এনসিপির নেতারা।

দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ওই ডকুমেন্টারিতে "বিএনপির বয়ানে ইতিহাসের একপেশে বর্ণনা" দেওয়ার কারণে প্রতিবাদ হয়েছে এবং এক পর্যায়ে তারা সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছেন।

দুই বছর আগে গণঅভ্যুত্থানে যারা সামনের সারিতে ছিলেন, তাদের কেউ কেউ এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান।

যেই তথ্যচিত্র নিয়ে হট্টগোল-সমালোচনা হয়, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমেদ নিজেও।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠানে প্রচারিত তথ্যচিত্রটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতা থেকেও পোস্ট করা হয় মঙ্গলবার রাতে।

তবে বুধবারের ঘটনাপ্রবাহের পর রাতে একটি সংবাদ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দুঃখপ্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

"...সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনাবলির যথাযথ প্রতিফলন না হওয়া সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত" ছিল দাবি করে বলা হয়, "কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা গণঅভ্যুত্থানে অবদান রাখা কোনো পক্ষের ভূমিকা খাটো করা, উপেক্ষা করা বা ইতিহাসের কোনো অংশকে আড়াল করার কোনো উদ্দেশ্য মন্ত্রণালয়ের ছিল না এবং নেই"।

তথ্যচিত্রটি 'সংশোধন' করে শিগগিরই জনসম্মুখে উন্মুক্ত করার কথাও বলা হয়।

হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ডায়াসে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। পাশেই টেবিলের পেছনে বসে আছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ

ছবির উৎস, Bangladesh Nationalist Party-BNP

ছবির ক্যাপশান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ নিজেও তথ্যচিত্রটি নিয়ে কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন

তথ্যচিত্র নিয়ে বিতর্ক কেন

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে 'জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা' শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

অনুষ্ঠানে প্রায় সোয়া দুই মিনিটের যে তথ্যচিত্র দেখানো হয় তাতে এক পর্যায়ে বলা হয়েছে, "তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আহ্বানে ছাত্রজনতাকে সাথে নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় নেমে আসে বিএনপি নেতাকর্মীরা। হাজারের ওপর শহীদের আত্মত্যাগে অর্জিত হয় ৫ই অগাস্ট"।

এ পর্যায়ে ওই ডকুমেন্টারিতে দেখানো হয় যে তারেক রহমান বলছেন, "দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় মানুষকে রক্ষায় হোক এই মুহূর্তের স্লোগান – দফা এক, দাবি এক- খুনি হাসিনার পদত্যাগ"।

এরপর ডকুমেন্টারির বিবরণীতে বলা হয়, "ছাত্র জনতা, শ্রমিক, শিশু কিশোর, গৃহবধূ, সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতিরোধের মুখে ভেঙ্গে পড়ে ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ প্রাচীর"।

সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হওয়া ভিডিওতে দেখা যায় ডকুমেন্টারিটি প্রচারের সাথে সাথেই অনুষ্ঠানস্থলে থাকা অনেকে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। মঞ্চে থাকা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের উদ্দেশ করে তারা নানা কথা বলছিলেন।

এ সময় মঞ্চে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। এক পর্যায়ে অনুষ্ঠানে থাকা বিদেশি অতিথিদের বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।

হই চই-এর এক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন মাইক্রোফোনে এসে বিক্ষুব্ধদের উদ্দেশে বলেন, "আপনারা কি নিজেদের জাহির করার জন্য আসছেন? ডকুমেন্টারি দেখানোর জন্য আসছেন? কী করছেন আপনারা? শহীদদের জন্য কী করছেন? শহীদ পরিবারের জন্য কী করছেন? কিছুই করেননি আপনারা"।

তথ্যচিত্রটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতা থেকেও পোস্ট করা হয়

ছবির উৎস, PMO Bangladesh

ছবির ক্যাপশান, তথ্যচিত্রটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতা থেকেও পোস্ট করা হয়

তার এ বক্তব্যে উপস্থিত অনেকেই আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে মাইক নিয়ে এনসিপি নেতা আখতার হোসেনের নাম উচ্চারণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সাথে তিনি প্রতিবাদকারীদের উদ্দেশে বলেন, "আপনাদের মধ্যে যে বক্তব্য দিতে চান দয়া করে এখানে এসে কথা বলুন। আপনাদের যে কেউ এখানে এসে বক্তব্য দিতে পারেন"।

পরে আখতার হোসেন মাইক নিয়ে বলেন, "আজকের দিনটা মহিমান্বিত দিন। এই মহিমান্বিত দিনটির সম্মানে শহীদ ও আহতদের সম্মানে আমরা এখানে শান্তভাবে বসে পড়বো। অনুষ্ঠানটি আমরা সম্পন্ন করবো"।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে মি. হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এটা বোঝাই যাচ্ছে যে তারা ইচ্ছে করেই এমন ডকুমেন্টারি করেছে, যেখানে একপেশে ইতিহাসের বর্ণনা করা হয়েছে। অভ্যুত্থানের ৯ দফা ও এক দফা, লংমার্চ টু ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো আসেনি। ফলে শহীদ পরিবার ও আহতরা একপেশে এ ডকুমেন্টারির প্রতিবাদ করেছেন। আমরা নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছি"।

তিনি বলেন, "ইশরাক হোসেন বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়েছে। বিএনপিকর্মীদের চড়াও আচরণে পরিস্থিতি বেগতিক হয়ে ওঠে। আমি মঞ্চে গিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এটি ছিল বিএনপি বয়ানে তৈরি করা ডকুমেন্টারি। সে কারণে আমরা অনুষ্ঠান থেকে চলে এসেছি"।

পরে এ নিয়ে নিজের বক্তৃতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, "নিশ্চয়ই ডকুমেন্টারিতে অনেক ভুল আছে। আমি দেখেছি আবু সাঈদের ছবিই নেই। আবু সাঈদ এ বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি প্রতীক। তার ছবি না থাকলে এটা কোনো ডকুমেন্টারি হলো না। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার ছবিও নেই। সুতরাং কিছু ভুল হয়েছে। বিদেশিরা চলে গেছে। জাতীয় অনুষ্ঠানে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা কাম্য ছিল না"।

মাহফুজ আলমের পোস্ট

ছবির উৎস, www.facebook.com/mahfuj.alam.49821

ছবির ক্যাপশান, মাহফুজ আলমের পোস্ট
সারজিস আলমের ফেসবুক পোস্ট

ছবির উৎস, facebook.com/sarjis.nirob

ছবির ক্যাপশান, সারজিস আলমের ফেসবুক পোস্ট

প্রতিক্রিয়া সামাজিক মাধ্যমে

এ ঘটনার পরপরই সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে পোস্ট দিতে শুরু করেন ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা অনেকে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় এ নিয়ে একটি পোস্ট করেন, যাকে 'জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন' ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।

মি. আলম ফেসবুকে লিখেছেন, "ইতিহাসের মাৎস্যনায় তো বাস্তব। বড় মাছ মেজো/ ছোট মাছ গিলে খাবে। মেজো/ছোট মাছ আবার বড় হয়ে অন্যদের গিলে খাবে। গত দুই বছরে কি হয়নি এসব? আবারো হবে, সময় এলে সেখানে অন্যরা থাকবে না। আপনি একটি আদর্শিক গ্রুপের বিরোধিতা করলে আপনাকে ইতিহাস থেকে নাই করে দেয়া হবে। যেনবা আপনি ছিলেনই না। থাকলেও গাদ্দারবত ছিলেন। যদিচ, কোনভাবে ঐ আদর্শিক গ্রুপের সাথে তাল মিলিয়ে চললে প্রধান ২/৪ পুতচরিত্রদের একজন হয়ে ওঠা কোন ইস্যুই ছিল না"।

এনসিপি নেতা সারজিস আলম তার ভেরিফায়েড পাতায় একটি পোস্টে লিখেছেন, "জনাব তারেক রহমান, ১ দফার ঘোষক হয়ে কেমন লাগছে"?

আরেক পোস্টে তিনি লিখেছেন, "চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি দেখিয়েছে। সেখানে ৩ আগস্টে ঘোষিত জুলাইয়ের ১ দফা নাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নামচিহ্ন পর্যন্ত নাই। ডকুমেন্টারিটা দেখলে মনে হতে পারে জুলাইয়ে কোনো গণঅভ্যুত্থান হয় নাই, বিএনপির দলীয় অভ্যুত্থান হয়েছে। ইতিহাসকে দখল করতে চাওয়ার আওয়ামী খাসলত বিএনপি ভালোই রপ্ত করেছে দেখা যাচ্ছে!"

শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের একজন মো. মাহিন সরকার ফেসবুকে এ নিয়ে যে পোস্ট দিয়েছেন। তিনি তার লেখার এক পর্যায়ে লিখেছেন, " ... ঐ ডকুমেন্টারিতে একদফার ঘোষক বানানো হয়েছে তারেক রহমানকে। যে নাহিদ ইসলাম নিজের মৃত্যুপরওনায় সাইন করে এক দফার ঘোষণা দিলেন তিনি বিএনপির ইতিহাসে নেই, যেই আসিফ মাহমুদ মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও লং মার্চ টু ঢাকা ঘোষণা করলেন তিনি ইতিহাসে নেই"।

ওই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য পরিচিত আব্দুল কাদের লিখেছেন, "আজকে নাকি রাষ্ট্রীয়ভাবে তারেক রহমানরে একদফার ঘোষক হিসেবে পোট্রে করছে। করুক, ইতিহাস লেখার জন্য তো অতো বেশি ত্যাগ লাগে না, লাগে ক্ষমতা। এটাই সার্বজনীন সত্য.............."।

'অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ'

তথ্যচিত্র নিয়ে দিনের এসব ঘটনাপ্রবাহের পর রাতে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

এতে বলা হয়, 'জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও আলোচনা সভায় প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ ও অবদান যথাযথভাবে উপস্থাপিত না হওয়ায় যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সে জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও মাননীয় প্রতিমন্ত্রী "আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন"।

"জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের যথার্থতা ও পূর্ণাঙ্গতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলের মতামতের ভিত্তিতে তথ্যচিত্রটি সংশোধন করে শিগগিরই পুনরায় জনসম্মুখে উন্মুক্ত করা হবে" বলেও জানায় মন্ত্রণালয়।

তারা জানায়, এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং আন্দোলনের প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণ করে তথ্যচিত্রটি প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জনের উদ্যোগ ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে।