সরেজমিন রূপপুর: জনমনে ভীতি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কীভাবে?

রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছের একটি গ্রাম
ছবির ক্যাপশান, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছের একটি গ্রাম
    • Author, আবুল কালাম আজাদ
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

পাবনার ঈশ্বরদীতে জয়া'র বাড়ির উঠোন থেকেই রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবকাঠামো দেখা যায়।। রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের খুব কাছেই নিজ জন্মভিটায় তার ছেলের জন্য ইটের গাথুনি দিয়ে পাকা ঘর তোলা হচ্ছে। তবে মধ্যবয়সী জয়া এবং তার পরিবারের ভয় এই নতুন ঘরে, বসবাস ক্ষণস্থায়ী হতে পারে রূপপূরের কারণে।

পারমানবিক কেন্দ্র নিয়ে উদ্বিগ্ন জয়া বলেন, "অনেকে বলে শুনি, এ বিদ্যুৎ চালু হলে এখানে থাকতে পারবে না গরমে তাপে।"

নতুন ঘর নির্মাণের কাজে ইট ভাঙতে ভাঙতে জয়া বলছিলেন, গ্রামের সবাই মৎসজীবী। শতাধিক পরিবারের বসবাস এখানে। জয়ার মতো জেলে পল্লী মাছুয়াপাড়ার অধিকাংশ মানুষই রূপপুরকে ঘিরে ভয়-ভীতির মধ্যে আছে।

পাড়া ঘুরে অনেকের মধ্যেই রূপপুর নিয়ে নানা ভ্রান্ত ধারণা ও উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে। নানা ধরনের গুজব, অপপ্রচার শুনে সেখানে আতঙ্কের দিকটাই বেশি দেখা যায়।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে কিনা, সেই ভয় বেশিরভাগ মানুষের। "ভবিষ্যতে সন্তান বিকলাঙ্গ হবে গরু বাছুর থাকবে না।" লোকমুখে এ ধরনের অপপ্রচারও ছড়িয়েছে।

সাধারণত পারমাণবিক দুর্ঘটনা থেকে ব্যাপকভাবে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে না পড়লে এ ধরনের কোনো সংকট হওয়ার সুযোগ নেই। পরমাণু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুর্ঘটনা এবং পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা অত্যন্ত সীমিত।

স্থানীয়দের মধ্যে কেউ কেউ ধারণা পেয়েছেন যে,, রূপপুরের কারণে ভয়ের কিছু নেই কিন্তু তারপরও তারা শতভাগ নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না।

পাড়ার অনেকে জানান, বিদ্যুৎ প্রকল্প সংশ্লিষ্ঠ বা সরকারের পক্ষ থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কিংবা তাদের ভীতি দূর করতে কখনো কেউ আসেনি। তাদেরকেও ডেকে কখনো সচেতন করা হয়নি।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছে নতুন ঘর তুলছে জয়া'র পরিবার
ছবির ক্যাপশান, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছে নতুন ঘর তুলছে জয়া'র পরিবার
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

পাকশী রেল স্টেশনের কাছে মো: তরিকুল ইসলাম বলেন, "বাংলাদেশে আর কোথাও এটা (পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র) নাই এই জন্য ভয়-ভীতি বেশি। অনেকে ঘরবাড়ি বানাচ্ছে না চালু হওয়ার পর নিশ্চিত হয়ে দালান কোঠা বানাবে।"

সাধারণত পারমাণবিক কেন্দ্রে দুর্ঘটনা ঘটলে যদি রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এবং ভীতি কাজ করে। পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে রূপপুরের নিকটবর্তী এলাকার মানুষ ছাড়াও বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের মধ্যেও ভয়-ভীতি কাজ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎ নিয়ে গবেষণা করছেন। রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিষয়ে এবং প্রকল্প এলাকার মানুষের জনমত জানাতে একটি জরিপের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ঠ ছিলেন।

বিবিসি বাংলাকে ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন শ্রেণী- পেশার ছয়শো মানুষের ওপর একটি জরিপ থেকে তিনি মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন।

"মানুষের কথা হলো এক্সিডেন্টের জন্য কিন্তু প্রস্তুতি প্রয়োজন। এই জরুরি অবস্থায় যদি তারা বাসাবাড়িতে থাকতে হয় তাহলে কীভাবে বাড়িতে থাকবে সেটার নির্দেশনা তারা জানতে চায়। আরেকটা যদি বলে যে এখান থেকে সরতে হবে তাহলে কোথায় সরতে হবে কীভাবে সরতে হবে, কোথায় থাকতে হবে সেটার নির্দেশনা প্রয়োজন।"

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

ছবির উৎস, ROSATOM

ছবির ক্যাপশান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় অধিবাসীদের সচেতন করতে কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়েছে। স্কুল কলেজ ও মসজিদ মাদ্রাসা থেকে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি সুবিধা তুলে ধরা হচ্ছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

"আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। পিপলস অ্যাওয়ারনেস প্রকল্প আছে। কিছুদিন আগে আমরা দেড়শো জন কৃষক একশো জন জেলে, মসজিদের ইমাম, স্কুল কলেজের শিক্ষকদের সমবেত করেছি। তাদেরকে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কে অবগত করা হয়েছে। কী ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে সেটাও বলেছি। সচেতন করা হয়েছে। বিষদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য প্রদান করা হয়েছে।"

ভবিষ্যতে এ ধরনের তৎপরতা আরো হবে বলে জানান মি. হাসান।

পারমাণবিক প্রযুক্তির উন্নতি

বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইতিহাসে তিনটি দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য। যার মধ্যে সোভিয়েত আমলে ইউক্রেনের চেরনোবিল দুর্ঘটনা ছিল সবচেয়ে মারাত্মক ও ভয়াবহ। ১৯৮৬ সালের ২৬শে এপ্রিল ওই দুর্ঘটনার পর এখনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশের বিশাল এলাকা জনশূন্য ও পরিত্যাক্ত পড়ে আছে। তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব এখনও আছে।

পারমাণবিক দুর্ঘটনার থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লে সেটি প্রাণ প্রকৃতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যে কারণে পারমাণবিক বিদ্যুৎ নিয়ে এক ধরনের ভীতি অনেকের মধ্যে কাজ করে।

চেরনোবিলে পারমাণবিক দুর্ঘটনার চল্লিশ বছর পূর্তির ঠিক দুদিন পর বাংলাদেশে প্রথম পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিটে জ্বালানি স্থাপন শুরু হলো।

দুটি বড় দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে মানুষের ভয় কাজ করে। একটা চেরোনোবিল আরেকটা জাপানের ফুকুশিমা। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওই দুর্ঘটনাগুলি থেকে শিক্ষা নিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

চেরনোবিলে সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চেরনোবিলে সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটে

বাংলাদেশে চালুর অপেক্ষায় থাকা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম প্রকল্প পরিচালক এবং পরমাণু বিজ্ঞানী ড. শৌকত আকবর বিবিসি বাংলাকে বলেন, চেরনোবিল সময়কার রিয়্যাক্টর থেকে বর্তমানের পারমাণবিক চুল্লির নিরাপত্তা অনেক বেশি।

"এখন চেরোনোবিলের পরে আমাদের ইনার কনটেইনমেন্ট আছে, আমার ফিউয়েল বা জ্বালানির নিজের সেইফটি আছে, ইন্টারনাল লাইনার আছে, আউটার কনটেইনমেন্ট আছে, কোর ক্যাচার আছে। অর্থাৎ এখন এভাবে সিচ্যুয়েশনটা তৈরি করা হয়েছে যে, ইন এনি সিচ্যুয়েশন যদি ফিজিক্সের সমস্ত সূত্র এখানে ফেইল করে দুর্ঘটনা ঘটলেও তেজস্ক্রিয়তা সুনির্দিষ্ট এলাকার বাইরে ছড়াতে পারবে না।"

বাংলাদেশে যে মডেলটি চালু হচ্ছে, এগুলো ডিজাইন হয়েছে ২০১৫ - ১৬ এই সময়ে। এসব কেন্দ্রে বহুস্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটেও তারপরেও প্রতিরোধের ব্যবস্থা এখানে আছে। এই মডেলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে 'কোর ক্যাচার' একটা বড় ধরনের আবিস্কার।

কোনো কারণে দুর্ঘটনা ঘটলেও তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম গলে রিয়্যাক্টরে চুল্লির নিচে ইস্পাতের পাত্রে, সেটি মাটির গভীরে জমা হবে এবং এমনভাবে আটকে রাখা হবে, যাতে মাটির নিচে চাপা থাকে। এবং রেডিয়েশন বাইরে যেতে না পারে বা লিক না হয়।

পরমাণু বিজ্ঞানীরা বলেন, দুর্ঘটনা হবে না, এরকম যন্ত্র পৃথিবীতে নাই, হবেও না। তবে দুর্ঘটনার হার খুবই অল্প আর কোনোক্রমে হলেও রেডিয়েশন বাইরে যাবার আশংকা এখন খুবই কম এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত। ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, এখন পারমানবিক প্রযুক্তি শক্তি হবে ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম উৎস।

"এখনকার পারমানবিক প্রযুক্তি কিন্তু যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনাকে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত। আমরা আশা করি যতধরনের কারণই হোক না কেন যদি দুর্ঘটনা ঘটে, আর ফুকুশিমা হবে না, আর চেরোনোবিল হবে না।"

ড. শৌকত আকবর
ছবির ক্যাপশান, ড. শৌকত আকবর

রূপপুরে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কী

রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রাশিয়ার ভিভিআর-১২০০ মডেলের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপন করা হয়েছে। রুপপুরে বহুস্তরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলেও দাবির করছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং এগুলো আন্তর্জাতিক বিধি বিধান ও দেশি বিদেশি সংস্থার তদারকির মাধ্যমেই নিশ্চিত হচ্ছে।

রূপপুরের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবব বিবিসি বাংলাকে বলেন, নিরাপত্তার বিষয়গুলি বিবেচনা করেই কন্সট্রাকশন এবং ইক্যুইপমেন্ট ম্যানুফাকচারিং হয়েছে। এবং সেই সেইফটি কীভাবে হবে সেটার জন্য আন্তর্জাতিক গাইডলাইন আছে। সেটা প্রতিটি ধাপেই অনুসরণ করা হয়েছে।

"রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যে ফিউয়েল দিলাম এইখানে যে ফিশন রিয়্যাকশন হলো, কোনো সিচ্যুয়েশনে এখান থেকে রেডিও একটিভিটি এবং নিউক্লিয়ারাইড কখনো কনটেইনমেন্ট স্ট্রাকচারের বাইরে যাবে না। ইট ইজ বাই ডিজাইন গ্যারান্টেড। এটা শুধু বাংলাদেশ দেখে নাই, এটা আইএইএ (আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা) দেখেছে, এটা রেগুলেটরি অথরিটি দেখেছে। এবং এই ধরনের ডিজাইনকে বিবেচনা করেই ডিজাইন কন্সট্রাকশন অর্ডার দেয়া হয়েছে।"

মি. আকবর বলছেন, এক্সিডেন্টও যদি হয় তারপরেও রূপপুরের আমাদের যে ফেন্সিং এই ফেন্সিংয়ের বাইরে রেডিয়েশন যাবে না পারমিসবল ডোজের বাইরে। ইট ইজ অলরেডি স্ট্যাবলিশ বাই ডিজাইন এন্ড গ্যারান্টেড।

"আমাদের ফুয়েল লোডিংয়ের জন্য লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, তখন এটা লিগ্যাল ডকুমেন্ট- যেটা অথোরাইজড বাই দ্য অ্যাক্ট, বাই আন্তর্জাতিক কনভেনশন যে, সেইফটি ইজ অ্যাড্রেসড।"

রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ফুয়েল লোডিং শুরু হয়েছে

ছবির উৎস, ROSATOM

ছবির ক্যাপশান, রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ফুয়েল লোডিং শুরু হয়েছে

প্রকল্প কর্মকর্তারা দাবি করছেন, পারমাণবিক কেন্দ্র নিয়ে মানুষের আতঙ্ক বা ভয়ের কোনো কারণ নেই। কারণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও যদি হয় তাহলেও রেডিয়েশন কনটেইনমেন্ট স্ট্রাকচারের মধ্যে কনফাইন্ড থাকবে।

"ইতিমধ্যে আমাদের অটোমেটেড রেডিয়েশন মনিটরিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে ২৩টি। পাওয়ার প্ল্যান্টের বাইরে সাড়ে বারো কিলোমিটার ও আঠারো কিলোমিটারে। এটা প্রথম দিন থেকে কী রেডিয়েশন লেভেলে আছে পাবলিক দেখার জন্য। সুতরাং পাবলিক এটা এটা চব্বিশ ঘণ্টা মনিটরিং করতে পারবে। যাতে পাবলিকের কনফিডেন্স বাড়ে। তখন সে দেখতে পারবে রেডিয়েশন লেভেল কখন কেমন। আজকে কী কালকে কী।"

বলেন ড. শৌকত আকবর।

রূপপুরে পারমাণবিক প্রকল্পের শুরু থেকেই জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্ঘটনা এড়াতে একদিকে প্রযুক্তি অন্যদিকে দক্ষ বিশেষজ্ঞরা সার্বক্ষণিক তৎপর ও নজরদারি নিশ্চিত করবে।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ২০১১ সালে ফুকুসিমার দাইচি যে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, সেখান থেকে যে শিক্ষা তা রূপপুরে কাজে লাগানো হয়েছে।

"রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ডিজাইন করার সময় একাধিক সেইফটি সিস্টেম ইনকরপোরেট করা হয়। যার মধ্যে অনেকগুলো একটিভ সেইফটি সিস্টেম কতগুলো প্যাসিভ সেইফটি সিস্টেম। একটিভ এবং প্যাসিভ সিস্টেমগুলির কোনো কোনো সিস্টেম মানুষের ইন্টারভেনশন ছাড়াই পরিচালিত হবে।"

ড. জায়েদুল হাসান
ছবির ক্যাপশান, ড. জায়েদুল হাসান

মি. হোসেন বলছেন, এটা জেনারেশন থ্রি প্লাস। জেনারেশন থ্রি প্লাসের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার আশঙ্কা দশ লক্ষে একটি। সেইফটির ক্ষেত্রে আমাদের এ ধরনের কোনো ইনসিডেন্ট হবার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তারপরেও সেইফটি অ্যানালাইসিস রিপোর্ট অনুযায়ী যে সমস্ত বিষয়গুলি পরিচালনা করা দরকার আমরা সেগুলি করেছি। রূপপুরের নিরাপত্তায় স্বয়ংক্রিয় এবং সার্বক্ষণিক মানুষের নজরদারি থাকছে।

"সেইফটি সিস্টেমগুলি পরিচালনার জন্য সাত হাজারের বেশি ইন্টারলক আছে। যেটা ইন্টারলক বলি যেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হবে। এই ইন্টারলকগুলি দ্বারা আমাদের সেইফটি সিস্টেম পরিচালিত হয়। পাশাপাশি এখানে ২৪/৭ বিভিন্ন ইউনিট কাজ করতেছে। অর্থাৎ এখানে যারা অপারেটর আছেন তারা ২৪/৭ সিস্টেম মনিটর করা হয়। সিস্টেম মনিটর এবং পরিচালনার মাধ্যমে সেইফটিগুলি এনশিয়র করা হয়।"

ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা

রাশিয়ার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের দাবি, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র এতটাই মজবুতভাবে তৈরি যে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমনকি বিমান আছড়ে পড়লেও তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর ভয় নেই। তবে প্রযুক্তি দিয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকলেও এ ধরনের প্রকল্প সঠিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা এবং সেফটি কালচার বা নিরাপত্তার সংস্কৃতি চর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পরমাণু বিশেষজ্ঞরা বলছেন রূপপুর সফলভাবে চালুর পর আজীবন ৬০-৮০ বছর পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাই হলো বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জের।

বাংলাদেশের মত দেশে নিরাপত্তার সংস্কৃতি খুবই দুর্বল, যে কারণে অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ রয়েছে। ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে। দক্ষ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সঠিক জায়গায় সঠিক লোক নিয়োগ দিতে হবে। নিরাপত্তার সংষ্কৃতিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

"কোয়েশ্চেনিং এটিচিউট থাকতে হবে। এখানে ভয়ে যদি কেউ কোনো সমস্যার কথা না বলে তাহলে এটা বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাহলে এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যেকোনো ব্যক্তি যে কোনো পদেই থাকুক না কেন, তাকে সঠিক জিনিসটা বলার সাহস তাকে যোগাতে হবে, উৎসাহ দিতে হবে তাহলে নিরাপত্তা সংস্কৃতি যে আমরা বলি সেটি সঠিকভাবে চর্চা হবে। তখন একটা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিরাপদভাবে টেকসই ভাবে চালানো সম্ভব হবো।"

ড. শফিকুল ইসলাম
ছবির ক্যাপশান, ড. শফিকুল ইসলাম

নিরাপত্তা সংস্কৃতির যদি অবহেলা করা হয়, ভবিষ্যতে এই প্ল্যান্ট সুষ্ঠুভাবে চালানো অন্তরায় হতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন শফিকুল ইসলাম।

এ ব্যাপারে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলছেন, নিরাপত্তার সংস্কৃতি উন্নয়নে জোর দেয়া হচ্ছে। আইএইএর একটি মিশনে এ বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

"সেফটি কালচারটা একদিনে উন্নত হয় না। এই কারণে আমরা সেফটি কালচার দিনে দিনে উন্নত করার চেষ্টা করতেছি। এক্ষেত্রে আমাদের প্রি ওসার্ট বা অপারেশনাল সেফটি রিভিউ টিম আইএইএ কর্তৃক পরিচারিত হয়েছে। তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেফটি কালচার আমরা কী পরিমাণ উন্নত হয়েছে। আইএইএ মিশনে আমাদের সেইফটি কালচার খুব ভালভাবে চেক করা হয়েছে। এবং আমরা ডে বাই ডে এটা উন্নত করতেছি।"

মি. হোসেনের দাবি, বাংলাদেশের রূপপুর প্রকল্পে সেফটি কালচার স্ট্যান্ডার্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।

"অচিরেই আরো উন্নত হবে। এবং এই সেফটি কালচারের মাধ্যমে আমরা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের সেফটি এনশিয়র হবে। এখানে সেফটি ফার্স্ট প্রথমে নিরাপত্তা কনসিডারে আসবে তারপর বাকি অন্যান্য বিষয়গুলো আসবে।"