'সেলফি থেকে জানলাম আমিই চুরি হওয়া শিশু'

দু'জনের চেহারার সাদৃশ্য সবাইকে আকৃষ্ট করেছিল।
ছবির ক্যাপশান, দু'জনের চেহারার সাদৃশ্য সবাইকে আকৃষ্ট করেছিল।
Published

১৯৯৭ সালে কেপটাউন হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগ থেকে একজন নার্সের পোশাক পরা নারীকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। তার কোলে তিন দিন বয়সী এক শিশু, যখন শিশুটির মা ঘুমিয়ে ছিল তখন তাকে সেখান থেকে তুলে আনা হয়।

এ ঘটনার ১৭ বছর পর, হঠাৎই সেই চুরি যাওয়া শিশুটি নিজের আসল পরিচয় আবিষ্কার করে বসে।

কেপ টাউনের জাওয়ান্সউইক উচ্চ বিদ্যালয়ে সেটি ছিল মিশেই সলোমনের শেষ বর্ষ । আর সেই ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সেখানে ভর্তি হলো ক্যাসিডি নার্স, যে কিনা ১৭ বছরের মিশেই-এর ৩ বছরের ছোট। কিন্তু অবিকল প্রায় তার মতোই দেখতে।

দু'জনের চেহারার সাদৃশ্য সবাইকে আকৃষ্ট করেছিল। যদিও মিশেই সেটি নিয়ে তেমন একটা ভাবেনি।

কিন্তু একদিন যখন দু'জনের একই করিডরে দেখা হলো তখন মিশেই হঠাৎ-ই তার প্রতি একধরনের ব্যাখ্যাতিত টান অনুভব করলো।

"আমার যেন মনে হয়েছিল যে আমি তাকে চিনতাম," সে বলেছিল, "এটা আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল, কিন্তু জানি না কেন এমনটা অনুভব করছিলাম।"

বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও মিশেই এবং ক্যাসিডি এরপর থেকে একসাথে অনেকটা সময় কাটাতে শুরু করে।

যখন কেউ তাদের জিজ্ঞাসা করতো যে তারা সম্পর্কে বোন কিনা তখন তারা রসিকতা করে বলতো, "আমরা ঠিক জানি না- হয়তো অন্য জীবনে ছিলাম!"

তারপর একদিন এই দুই মেয়ে একটি সেলফি তুললো এবং সেটি সবাইকে দেখালো।

মিশেই-এর মা লাভোনা- যে তার মেয়েকে ডাকতেন 'প্রিন্সেস' বলে এবং বিভিন্ন জায়গায় সাথে করে নিয়ে যেতেন, তিনি বললেন যে দুটি মেয়ের চেহারাই একরকম।

মিশেই এর বাবা মাইকেল জানালেন যে, তিনি তার মেয়ের বন্ধুটিকে চিনেছেন, তার বাবার একটি বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের দোকান রয়েছে।

কিন্তু ক্যাসিডির বাবা-মা'এর প্রতিক্রিয়া হলো ভিন্ন। তারা তীব্র দৃষ্টি তাকিয়ে ছিল ছবিটির দিকে। তারা ক্যাসিডিকে জানালেন যে মিশেই-এর কাছে তাদের একটি প্রশ্ন আছে।

যখন মেয়ে দুটোর আবার দেখা হলো তখন ক্যাসিডি জানতে চাইলো, "তোমার জন্ম কি ১৯৯৭ এর ৩০ এপ্রিল?"

মিশেই অবাক হলেও পরে স্বীকার করে যে সেটিই ছিল তার জন্মদিন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

মিশেই সলোমন

ছবির উৎস, MPHO LAKAJE

ছবির ক্যাপশান, মিশেই সলোমন

সপ্তাহখানেক পর, অংক ক্লাশ থেকে মিশেইকে অপ্রত্যাশিতভাবে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ডেকে আনা হয়। সেখানে দু'জন সমাজকর্মী অপেক্ষায় ছিলেন। তারা মিশেইকে ১৭ বছর আগে কেপটাউনের এক হাসপাতাল থেকে জেফানি নার্স নামে ৩ দিন বয়সী এক শিশু অপহরণের গল্প বলেন। যে শিশুটির খোঁজ পরে আর পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনা কেন মিশেই কে বলা হচ্ছে তা সে জানতে চায়। তখন সমাজকর্মীরা বলেন যে, তাদের কাছে এমনকিছু প্রমাণ এসেছে যে তাদের ধারনা হয়েছে মিশেই সেই হারিয়ে যাওয়া শিশু।

মিশেই তখন তাদের বলেছিল যে, সমাজকর্মীরা যে হাসপাতালের কথা বলছেন তার জন্ম সেখানে নয়, তার জন্ম সনদেই তা উল্লেখ আছে। কিন্তু সমাজকর্মীরা জানালেন যে উল্লেখিত হাসপাতালে তার জন্মের কোনো উল্লেখ নেই।

মিশেই-এর তখনো ধারনা ছিল যে কোথাও কোনো বড় ভুল রয়েছে, আর তাই সে ডিএনএ টেস্টে রাজি হয়।

কিন্তু তার আশানুরূপ ফল মেলেনি। ডিএনএ টেস্টে প্রমাণিত হয়, ১৯৯৭ সালে গ্রুট শুর হাসপাতাল থেকে চুরি যাওয়া জাফনি নার্স এবং মিশেই সলোমন একই ব্যক্তি।

চুরি যাওয়া শিশুটি এবং যৌবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো তরুণীর গল্প প্রায় দুই দশক পর দক্ষিণ আফ্রিকা এবং পুরো বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিল। আর মিশেই-এর জীবনও বদলে যায় তখনই।

১৮ বছর হতে তখন তার ৩ মাস বাকি, তাকে বলা হয়েছিল তার আগ পর্যন্ত সে একটি সেফ হোমে থাকবে। এরপর সে নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে কোথায় যাবে।

এ সময় মিশেই আরো কষ্টকর খবর পেয়েছিল। লাভোনা সলোমন, যে নারীকে মা হিসেবে বিশ্বাস করে সে বড় হয়েছে- তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মিশেই বলে, "এটি আমাকে মুষড়ে দেয়। তাকে আমার অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞাসার ছিল, কেন? কী হচ্ছে?"

লাভোনা সলমনের সাথে নবজাতক মিশে
ছবির ক্যাপশান, লাভোনা সলমনের সাথে নবজাতক মিশে

তবে লাভোনার স্বামী মাইকেল- যাকে মিশেই এতদিন বাবা বলে জেনেছে, তাকে যখন পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে তখন মিশেই সেখানে ছিল।

"তার মুখে যন্ত্রণার ছাপ দেখেছি, চোখে যেন রক্তক্ষরণ। আমি সত্যিই ভয় পেয়ে যাই," মিশেই বলে। মাইকেল বিস্মিত হয়ে মিশেই কে তার নিজের মেয়ে বলেই দাবি করেছিল।

মিশেই কে তার জৈবিক বাবা-মা'এর কাছ থেকে অনুমতি ছাড়া আনা হয়েছে এটি মাইকেল জানতেন না।

সে পুলিশকে বলে যে, লাভোনা সে সময় গর্ভবতী হয়েছিল। কিন্তু পরে সে গর্ভপাতের ঘটনা লুকিয়ে রেখে হাসপাতাল থেকে জেফানি নার্সকে চুরি করে এনে নিজের সন্তান বলে দাবি করে।

যদিও সেলেস্টে এবং মরণে নার্স দম্পতির এরপর তিনটি সন্তান জন্ম নেন, তারপরও তারা তাদের চুরি যাওয়া প্রথম সন্তান জেফানির খোঁজ কখনো ছাড়েননি। প্রতিবছরই তারা তার জন্মদিনটি পালন করতেন এমনকি তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবার পরও।

তবে তাদের চুরি যাওয়া শিশু বেশ কাছাকাছিই বড় হয়েছে। সলোমনদের বাসা নার্সদের বাসা থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে ছিল।

এখন, এক অসাধারণ ঘটনাক্রমে নার্স পরিবারের প্রার্থনা মঞ্জুর হয়েছে। সমাজকর্মীরা মিশেই কে একটি থানায় পুলিশের সামনে তার প্রকৃত বাবা-মা এর কাছে হস্তান্তর করে।

"তারা আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল, চেপে ধরে কাঁদতে শুরু করে। কিন্তু কেন যেন আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলাম না। কি যেন একটা ঠিক ছিল না বলে মনে হয়েছে," বলছিল মিশেই।

তার ভাষ্যমতে বিষয়টি দুঃখজনক হলেও আমার মনে হয়নি যে আমি আমার আসল বাবা-মা'কে কখনো অনুভব করতে পেরেছি।

মিশেই তখন একধরনের মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। যে বাবা-মা'এর তার হারিয়ে যাওয়া সময়কে পুষিয়ে দিতে মরিয়া- কিন্তু আসলে তারা মিশেই-এর কাছে অপরিচিত। আর অন্য যাদের সে সত্যিই ভালবেসেছিল- তারা বিধ্বস্ত এবং কারাগার সেখানে ছিল একটি বড় বাধা।

২০১৫ সালের আগস্ট মাসে কেপ টাউন হাইকোর্টে লাভোনার বিচার শুরু হয়।

আট মাস বয়সী মিশের সাথে মাইকেল
ছবির ক্যাপশান, আট মাস বয়সী মিশের সাথে মাইকেল

বিচারকালীন সময়ে সে নিজের অন্যায়কে অস্বীকার করে। বলে যে সে বারবার গর্ভপাতের স্বীকার হবার পর একটি শিশুকে দত্তক নেবার ব্যাপারে মরিয়া হয়ে ওঠে। সে সময় সিলভিয়া নামের একজন তাকে একটি শিশু দেবার ব্যাপারে জানায়। তবে সিলভিয়ার কোনো অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়নি।

এরপর, প্রায় দুই দশক পরেও একজন মহিলা সাক্ষী দেন। তিনি মনে করতে পারেন যে, সেবিকার পোশাক পরিহিত এক নারী ঘুমন্ত সেলেস্টের পাশ থেকে একটি শিশুকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। তিনি লাভোনাকে সনাক্তও করেন। ফলে লাভোনার বিরুদ্ধে সকল প্রমাণই আদালত গ্রহণ করে।

অপহরণ, জালিয়াতি ও শিশু আইন লঙ্ঘনের দায়ে ২০১৬ সালে লাভোনা সলোমনের ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়।

মিশেই-এর তখন মনে হয়েছিল যেন তারও মৃত্যু হয়েছে। কেননা যাকে সে এতদিন মা হিসেবে জেনেছে, তাকে ছাড়া তার পক্ষে কিভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব- এমনটাই ছিল তার অনুভূতি।

সে বছরের শেষের দিকে মিশেই জেলখানায় লাভোনার সাথে দেখা করতে আসে। স্কুলে সমাজকর্মীদের আসার পর এই প্রথম দেখা হয় দু'জনের।

"সেটা ছিল একটি জানালার ভেতর দিয়ে কথা বলার সুযোগ। আর যখন আমি আমার মা'কে কয়েদীদের পোশাকে দেখলাম, কান্না থামিয়ে রাখতে পারিনি।"

মিশেই লাভোনার কাছে সেদিন সত্যটি জানতে চেয়েছিল। কেন সে তাকে হাসপাতাল থেকে এনেছিল।

মিশেই-এর বহু প্রশ্নের জবাবে লাভোনা তাকে কেবল বলেছিল যে, একদিন সে তাকে সবকিছু বলবে।

যাই হোক মিশেই কোনো ক্ষোভ পুষে রাখেনি।

লাভোনা সলমন (মুখ ঢাকা) আদালতে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লাভোনা সলমন (মুখ ঢাকা) আদালতে

"ক্ষমা করলে আসলে হৃদয় শান্ত হয়। জীবন থেমে থাকেনা। সে জানে যে আমি তাকে ক্ষমা করেছি এবং এখনো তাকেই ভালোবাসি," মিশেই বলে।

নিজের আসল পরিচয় আবিষ্কারের চার বছরের বেশী হয়ে গেছে। ২০১৫ সালের এপ্রিলের শেষে যখন তার বয়স ১৮ বছর হয়, তখন সে তার প্রকৃত বাবা-মা'এর কাছে ফিরে যাবার কথা ভেবেছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিপরীত।

"তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়, পারিবারিক বন্ধন এলোমেলো হয়ে পরে," মিশেই জানায়। আর তারপর সে সুস্পষ্টভাবে নিজের স্থিতিশীলতার কথা ভেবে মাইকেল- তার আগের বাবা'র কাছে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। সেটিই ছিল তার জন্যে নিরাপদ স্থান, তার প্রকৃত বাড়ি।

মিশেই তার আসল পরিবারের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখতে বেশ সংগ্রামই করেছে।

সে এখনো লাভোনার সাথে জেলখানায় দেখা করতে ১২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসে। মিশেই এর নিজেরই এখন দুটো সন্তান রয়েছে।

লাভোনা সলোমনের মুক্তি পেতে আরো ছয় বছর সময় বাকী। মিশেই বলে যে, সে প্রায়শই চায় যেন সময়টি 'তাড়াতাড়ি' শেষ হয়ে যায়। সে তার 'মা'-এর বাড়ি ফেরার জন্যে অপেক্ষায় আছে।

আশ্চর্যজনকভাবে তার জন্মের সময়ের নাম 'জেফানি' আর 'মিশেই' নামের মধ্যে পরবর্তী নামটি বেছে নিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। যে নারী তাকে আসলে চুরি করে এনেছিল, ভালোবাসা দিয়ে সেই তাকে জয় করে নিয়েছে।