ইন্দোনেশিয়ায় শক্তিশালী হচ্ছে জঙ্গিরা?

ইন্দোনেশিয়া গীর্জা

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, ইন্দোনেশিয়ার সুরাবায়া প্রদেশে তিনটি গীর্জায় হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৩জন
Published

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের মত বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম প্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি হামলা হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই হামলাকারীরা তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের সাথে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।

২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় বিস্ফোরণ ও গুলিতে চার বেসামরিক নাগরিক ও চার হামলাকারী নিহত হয়েছিলেন। সেবারই প্রথম ইন্দোনেশিয়ায় হওয়া কোনও জঙ্গি হামলার দায় স্বীকার করে আই-এস।

পরবর্তীতে বলা হয় জাকার্তায় হামলাকারীরা ইন্দোনেশিয়া ভিত্তিক জেমাহ আনসারুত দৌলা ( জেএডি) জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্য, যারা অতীতে নিজেদের আই-এস এর সাথে সম্পৃক্ত বলে দাবী করেছিল।

তার পর থেকেই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় জঙ্গি তৎপরতা বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করে আই-এস।

আরো পড়ুন:

ভিডিওর ক্যাপশান, 'আমি যে কত মানুষ হত্যা করেছি তা মনে নেই'

আই-এস কীভাবে এই অঞ্চলকে প্রভাবিত করে?

জাকার্তা হামলার পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রচারণা বাড়ায় আই-এস। সমর্থকদের আরো আক্রমণের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে ও সরকারকে হুমকি দেয়ার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ভিডিওতে তারা ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকদের ব্যবহার করে।

ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল গ্যাতত নুর্মান্তায়ো ২০১৭'তে এক বক্তব্যে বলেন যে ইন্দোনেশিয়ার প্রায় সব প্রদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে আই-এস।

ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানের মৌলবাদী চিন্তাধারীরা ইন্টারনেট ও জিহাদি ওয়েবসাইট থেকে দীক্ষা-প্রাপ্ত নবাগত সদস্য অথবা পুরনো প্রজন্মের জঙ্গিদের সমর্থক। তবে আগের প্রজন্মের জঙ্গিবাদীদের সাথে বর্তমানে সক্রিয়দের খুব একটা সম্পর্ক নেই মনে করা হচ্ছে।

আই-এস এর সাথে নিজেদের সম্পর্ক আছে বলে দাবী করেছে ৩০ টির মত ইন্দোনেশিয়ান দল। যাদের মধ্যে কয়েকটি দল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আই-এস এর আনুষ্ঠানিক প্রদেশ তৈরি করার বিষয়েও সোচ্চার ছিল।

গত কয়েকবছরে সিরিয়া ও ইরাকে আই-এস এর পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে অনেকে দেশত্যাগ করেছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ার এসব জিহাদি গোষ্ঠীর অন্যতম প্রভাবশালী নেতা মনে করা হয় জেএডি'র নেতা আমান আব্দুর রহমানকে, যিনি গত ১২ বছর ধরে ইন্দোনেশিয়ায় কারাগারে রয়েছেন।

সমর্থকদের সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিচারকার্য চলছে। বর্তমানে যেই কারাগারে তিনি রয়েছেন সেটিকে বিশ্লেষকরা আই-এস সমর্থক জঙ্গিদের চারণভূমি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

ইন্দোনেশিয়া কীভাবে এই সঙ্কট মোকাবেলা করছে?

২০০২ এ বালির একটি নাইটক্লাবের বাইরে আল কায়েদার সাথে সম্পর্ক থাকা জঙ্গিদের করা বোমা হামলায় ২০২ জন মারা যায়। এরপর ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী উগ্রপন্থী দলগুলোর ওপর কঠোর অভিযান চালায়।

ঐ অভিযানে ব্যাপক গ্রেফতার ও পরিকল্পিত হত্যাসহ ইন্দোনেশিয়ান জঙ্গিদের মনোভাব পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে নানা ধরণের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ছাড়া পাওয়া জঙ্গিদের পুনর্বাসনের জন্যও নেয়া হয় বিভিন্ন উদ্যোগ।

বালির বোমা হামলার পর ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ প্রায় ৮০০ জঙ্গিকে গ্রেফতার করে আর ১০০ জনের বেশী জঙ্গিকে হত্যা করা হয়।

বালির নাইটক্লাবের ধ্বংসাবশেষ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০০২ সালে বালিতে বোমা হামলায় মারা যায় ২০০'র বেশ মানুষ

ইন্দোনেশিয়ায় হওয়া জঙ্গি হামলা

ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সুরা-বায়া'র তিনটি গির্জায় হওয়া সর্বশেষ হামলায় ১১ জন নিহত হওয়ার ঘটনাটি ২০০৫ এর পর ইন্দোনেশিয়ায় হওয়া সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী হামলা। ২০০৫ এ বালিতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে ২০ জনের বেশী মানুষ মারা যায়।

তবে গত কয়েকবছরে ইসলামপন্থী জঙ্গিদের বেশ কয়েকটি করা হামলা হয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়।

  • ২০০২ অক্টোবর : বালির কুতা বিচের নাইটক্লাবে বোমা হামলায় মারা যায় ২০২ জন। নিহতদের অধিকাংশই ছিল পর্যটক।
  • ২০০৩ অগাস্ট : জাকার্তার ম্যারিয়ট হোটেলের বাইরে গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে মারা যায় ১৪ জন।
  • ২০০৪ সেপ্টেম্বর : জাকার্তার অস্ট্রেলিয়ান দূতাবাসের বাইরে গাড়ি বোমা হামলায় ৯ জন নিহত ও আহত হয় ১৮০ জনের বেশী।
  • ২০০৫ অক্টোবর : বালিতে তিনটি আত্মঘাতী বোমা হামলায় হামলাকারী সহ মারা যায় ২৩ জন।
  • ২০০৯ জুলাই : জাকার্তার ম্যারিয়ট ও রিটজ-কার্লটন হোটেলে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হয় ৯ জন।
  • ২০১৬ জানুয়ারি : জাকার্তায় একটি বোমা ও গুলি হামলায় দুইজন বেসামরিক ব্যক্তি ও সাতজন হামলাকারী নিহত হয়। হামলার দায় স্বীকার করে আই-এস।
  • ২০১৭ মে: জাকার্তায় আত্মঘাতী বোমা হামলায় মারা যান অন্তত তিনজন পুলিশ অফিসার; আহত হন ১০ জন।
  • ২০১৮ ফেব্রুয়ারি : ইয়োগিয়াকার্তা প্রদেশের স্লেমানে একটি গির্জায় তলোয়ার নিয়ে হামলা করা হলে আহত হন অনেকে।
  • ২০১৮ মে : উচ্চ নিরাপত্তা বিশিষ্ট একটি কারাগারে ইসলামপন্থী জঙ্গিদের সাথে সংঘর্ষে নিহত হন পাঁচজন পুলিশ অফিসার।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন: