বাজেটে বাড়তে ও কমতে পারে যেসব পণ্যের দাম

বাজেট ঘোষণার পরে কিছু পণ্যের দাম বাড়ে, কিছু পণ্যের দাম কমে

ছবির উৎস, Getty Images

Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে পরবর্তী অর্থবছরের জন্য নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করছেন।

দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। বলা হচ্ছে, টাকার অঙ্কে দেশের ইতিহাসে এটি সব থেকে বড় বাজেট প্রস্তাবনা।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ঘোষিত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। যা তার আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের তুলনায় সাত হাজার কোটি টাকা কম ছিল।

নতুন প্রস্তাবিত বাজেটে উৎস কর, ভ্যাট, শুল্ক ও সারচার্জ বাড়ানোর ফলে বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

আবার কিছু খাতে ভর্তুকি ও করছাড় দেওয়ার ফলে কমতে পারে পণ্যের দাম।

এছাড়া বাজেটে দেশের প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসা বাণিজ্য অর্থাৎ স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সুবিধা দিতে নানা ধরণের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।

চলুন জেনে নেওয়া যাক, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর কোন পণ্যের দাম বাড়তে পারে, আর কোন পণ্যের দাম কমতে পারে।

কয়েন

ছবির উৎস, Getty Images

যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে

আমদানিকৃত ওয়াশিং মেশিন ও ইলেকট্রিক ওভেন

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

নাগরিক জীবনে বর্তমানে অপরিহার্য পণ্যে পরিণত হয়েছে ওয়াশিং মেশিন ও ওভেন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্থানীয় পর্যায়ে ওয়াশিং মেশিন উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এ পণ্য আমদানিতে নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ফলে আমদানিকৃত ওয়াশিং মেশিনের দাম বাড়বে।

অন্যদিকে, ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন প্রস্তুতকারী শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ফ্লোট গ্লাস আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ফলে দেশে উৎপাদিত ওয়াশিং মেশিন ও ওভেনের দাম কমতে পারে।

ডিজেল ও অকটেন চালিত গাড়ি

ডিজেল, অকটেন বা পেট্রোল চালিত গাড়ি আমদানিতে কর বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ফলে ডিজেল, অকটেন বা পেট্রোল চালিত গাড়ির দাম বাড়তে পারে।

তামাকজাত পণ্য

এ বছর বাজেটে বাণিজ্যিক আমদানিকারকেরা যে সিগারেট পেপার আমদানি করেন তাতে সম্পূরক শুল্কের হার ৩০০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ শতাংশ করা হয়েছে।

ফলে সিগারেটের দাম বেড়ে যেতে পারে।

সাইকেল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দেশীয় সাইকেল শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানিকৃত বাইসাইকেল যন্ত্রাংশের দাম বাড়বে

বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ

প্রস্তাবিত বাজেটে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।

একই সাথে নতুন করে পাঁচ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ফলে আমদানিকৃত বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশের দাম বাড়তে পারে।

আমদানিকৃত কাগজ

স্থানীয় কাগজ শিল্পকে সুরক্ষা দিতে গ্রিজ প্রুফ পেপার ও গ্লাসিন পেপার আমদানির ওপর বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা এবং একই সাথে পাঁচ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ফলে আমদানিকৃত কাগজের দাম বাড়তে পারে।

বৈদ্যুতিক মোটর

দেশীয় মোটর উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ১২০০ ওয়াটের নিম্ন ক্ষমতাসম্পন্ন ডিসি মোটর আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এতে করে আমদানিকৃত কম ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক মোটরের দাম বাড়তে পারে।

আমদানিকৃত কাজুবাদাম

দেশীয় চাষ ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

যার ফলে আমদানিকৃত কাজুবাদামের দাম বাড়তে পারে।

কাজুবাদাম

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আমদানিকৃত কাজুবাদামের দাম বাড়তে পারে

জিপসাম বোর্ড ও শিট

স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা জিপসাম বোর্ড ও শিট উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে জিপসাম বোর্ড ও শিট আমদানির ওপর ২০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ফলে এই ধরণের পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

দাম কমতে পারে যেসব পণ্যের

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কৃষিপণ্য

প্রস্তাবিত বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০ টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এতে করে কৃষি ও ভোগ্যপণ্য, যেমন-ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম কমতে পারে।

শিশুখাদ্য

শিশু খাদ্যের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

যার ফলে দেশের বাজারে আমদানিকৃত শিশুখাদ্যের দাম কমতে পারে।

সার ও কীটনাশক

ব্যবসায়ী পর্যায়ে সকল সারের ওপর প্রযোজ্য সাত দশমিক পাঁচ শতাংশ ভ্যাট এবং সব ধরনের কীটনাশক আমদানি পর্যায়ে সাত দশমিক পাঁচ শতাংশ আগাম কর পুরোপুরি অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়া স্থানীয় শিল্পকে উৎসাহ দিতে কীটনাশক উৎপাদনে প্রয়োজনীয় ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর পুরোপুরি মওকুফ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ফলে কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশকের দাম কমতে পারে।

দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের ওপর কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে
ছবির ক্যাপশান, বাজাটে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের ওপর কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে

হার্টের রিং ও চোখের লেন্স

আমদানিকৃত হার্টের রিং বা স্টেন্ট এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের সরবরাহের ক্ষেত্রে যোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে।

ফলে হার্টের রিং বা স্টেন্টের মূল্য প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং চোখের প্রতিটি ইন্ট্রাওকুলার লেন্স এর মূল্য প্রায় পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।

এছাড়া ক্যানসারের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত নতুন নয় ধরনের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক শূন্য করার প্রস্তাবও রয়েছে।

ডায়ালাইসিস ফিল্টার

কিডনির রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং পাঁচ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়া কিডনি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত 'ব্লাড টিউবিং সেট ফর হেমোডায়ালাইসিস' এর আমদানি পর্যায়ে থাকা সাত দশমিক পাঁচ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর ফলে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের ব্যয় কমতে পারে।

ইলেকট্রিক গাড়ি

দেশে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি উৎপাদন এবং ইলেকট্রিক গাড়ির যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য শুল্ক কর রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়া প্লাগ ইন হাইব্রিড যানবাহন আমদানিতে গাড়ির ধরণভেদে রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে এ ধরণের গাড়ির দাম কমতে পারে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

ছবির উৎস, SCREEN GRAB

ছবির ক্যাপশান, জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব পাঠ করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

স্থানীয় প্রসাধনী পণ্য

স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত স্কিন কেয়ার ও বিউটি প্রোডাক্টস শিল্পের দুইটি কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ফলে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত প্রসাধনী পণ্যের দাম কমতে পারে।

গিটার, পিয়ানো

মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট যেমন - গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন আমদানিতে বিদ্যমান পাঁচ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ফলে এ ধরণের পণ্যের দাম কমতে পারে।

ক্যামেরা ও প্রজেক্টর

উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা এবং সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে পাঁচ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর ফলে ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের দাম কমতে পারে।

মসলা ও খেজুর

দৈনন্দিন রান্নায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের মসলা এবং খেজুরের ওপর পাঁচ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে, ফলে দাম কমতে পারে।

সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স

দেশে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স আমদানিতে বিদ্যমান ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে শূণ্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত প্রসাধনী পণ্যের দাম কমতে পারে

ছবির উৎস, Getty Images

মোবাইল ফোন ও তথ্যপ্রযুক্তি

মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজন, এবং কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনার ইত্যাদি প্রযুক্তি পণ্যের স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্থানীয় মোবাইল ফোন শিল্পের ২২ ধরনের কাঁচামালের ওপর অগ্রিম কর কমিয়ে পাঁচ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এতে দেশে উৎপাদিত ও সংযোজিত পণ্যের দাম অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

পয়েন্ট অব সেলস মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে পাঁচ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। আর এ পণ্যের অগ্রিম করও শূন্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মোবাইল সিম

মোবাইল সিমের উপর আরোপিত ৩০০ টাকা হারে কর সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সাথে আইসিটিকে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে গড়ে তুলতে এ খাতে ট্যাক্স, ভ্যাট ও লাইসেন্সিং নীতিমালা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বর্তমানে টেলিকম সেক্টরে করের হার প্রায় ৫০ শতাংশ এবং তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রায় ২৫ শতাংশ।

কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সাদের জন্য সুবিধা

প্রস্তাবিত বাজেটে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কন্টেন্ট তৈরি করে আয় করছেন এমন কর্মীদের উৎসাহ দিতে দেশের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেবা আমদানির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের স্থান ও স্থাপনা ভাড়া গ্রহণের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ২০৩৫ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।