ভারতে খেলবে না বাংলাদেশ, আইসিসি এখন কী করতে পারে?

মোস্তাফিজুর রহমানকে কেকেআর থেকে বাদ দেওয়ায় নিরাপত্তা ইস্যুতে বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বলে আইসিসিকে জানিয়েছে বাংলাদেশ

ছবির উৎস, Dibyangshu SARKAR / AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মোস্তাফিজুর রহমানকে কেকেআর থেকে বাদ দেওয়ায় নিরাপত্তা ইস্যুতে বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বলে আইসিসিকে জানিয়েছে বাংলাদেশ
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না জানানোর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) কী পদক্ষেপ নেয় সেদিকেই এখন দৃষ্টি সবার।

এর মধ্যে আইপিএল খেলা বাংলাদেশে সম্প্রচারে বন্ধ রাখারও নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।

এমন পরিস্থিতি আজই বা কাল কিংবা দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য আইসিসি ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি'র মধ্যে যে কোনো সময়েই একটি ভার্চুয়াল বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বকাপ আইসিসির ইভেন্ট এবং যে দেশই এই ইভেন্টের আয়োজক হোক না কেন এর নিয়ন্ত্রণ থাকে আইসিসিরই হাতে, এমনকি এর নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো এই সংস্থাটির তত্ত্বাবধানেই নিশ্চিত হয়ে থাকে।

অর্থাৎ আইসিসিই স্বাগতিক দেশের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী দলের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে।

এবার ভারত ও শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার কথা আগামী ৭ই ফেব্রুয়ারি। টুর্নামেন্টে ভারতে যে ম্যাচগুলো হবে তার প্রথমটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশের।

এই বিশ্বকাপের সূচি অনুযায়ী প্রথম বা গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ চারটি ম্যাচ খেলার কথা। এর তিনটি কলকাতায় আর একটি মুম্বাইয়ে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো নিয়ে ভারতীয় বোর্ডের কিছু করার নেই, বরং কিছু করার থাকলে সেটি আইসিসিকেই করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, আইপিএল ভারতের একটি অভ্যন্তরীণ টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। এই টুর্নামেন্টে এবার একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে মোস্তাফিজুর রহমান খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। নিলামে তাকে কিনে নিয়েছিল কোলকাতা নাইট রাইডার্স বা কেকেআর।

এর আগেও আইপিএলে খেলেছেন মোস্তাফিজুর রহমান

ছবির উৎস, BCCI

ছবির ক্যাপশান, এর আগেও আইপিএলে খেলেছেন মোস্তাফিজুর রহমান

আইসিসির তাহলে করণীয় কী

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি সিরিজ বা টুর্নামেন্টের আগে যে 'ডিটেইলস সিকিউরিটি প্লান' নেওয়া হয় সেখানে টিমের হোটেলে অবস্থান, স্টেডিয়ামে আসা-যাওয়া, আক্রান্ত হলে ইভাকুয়েশন বা বিকল্প পথে কিভাবে সরিয়ে নেওয়া হবে, কেউ আহত হলে হাসপাতালে নেওয়া- এমন সব বিস্তারিত বিষয় চূড়ান্ত করা হয়ে থাকে।

বিসিবির সাবেক পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি বলছেন, এগুলো বিস্তারিত দেখেই দেশগুলো তাতে স্বাক্ষর করে থাকে।

"কিন্তু এখন যেহেতু বাংলাদেশের দিক থেকে একটা উদ্বেগ এসেছে। সেটি আইসিসি পর্যালোচনা করতে পারে। আমার মনে হয় বাংলাদেশ যদি সরেজমিন দেখতেও যেতে চায় সেটি আইসিসি করতে পারে। সবাই মিলেই একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাতে দিন শেষে ক্রিকেট ক্ষতিগ্রস্ত না হয়," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

কিন্তু বাংলাদেশ যদি আইসিসির সাথে আলোচনাতেও ভারতে না খেলার বিষয়ে অনড় থাকে,তাহলে টুর্নামেন্টের এই পর্যায়ে আইসিসির পক্ষে বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ী নতুন কোনো ব্যবস্থা করা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে ২০০৯ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে জিম্বাবুয়ে সরে যাওয়ায় স্কটল্যান্ডকে সেবার টুর্নামেন্টে অন্তর্ভুক্ত করেছিল আইসিসি।

কিন্তু এবার সময় খুব কম হাতে থাকার কারণে বাংলাদেশ ভারতে খেলতে না গেলে বা গ্রুপ পর্বের ম্যাচে বাংলাদেশ অংশ না দিলে বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়ারও এখতিয়ার আছে সংস্থাটির।

তবে ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিজেরা আলোচনার মাধ্যমে বিসিবিকে বিদ্যমান ব্যবস্থায় খেলতে রাজি করানোর পাশাপাশি ভারতীয় বোর্ডের মাধ্যমেও চেষ্টা করতে পারে আইসিসি।

আবার কোনো পদক্ষেপেই সুরাহা না হলে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ারও আছে আইসিসির, যদিও নিরাপত্তা ইস্যুতে সংকট তৈরি হওয়ায় সেই সম্ভাবনা কম বলেই মনে করা হচ্ছে।

আইসিসি ও বিসিবির মধ্যে বৈঠকের পরই আসলে আইসিসির দিক থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

আবার অনেকের ধারণা, ইস্যুটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিবেচনা করে আইসিসি দৃষ্টি না দেওয়ার নীতি নিলে বাংলাদেশ ছাড়াই এই বিশ্বকাপ সম্পন্ন হতে পারে।

মোস্তাফিজ ইস্যুতে ভারত-বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মোস্তাফিজ ইস্যুতে ভারত-বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া

আগের ঘটনায় কী হয়েছে

সাধারণত দ্বিপাক্ষিক সিরিজ ও বিশ্বকাপের মতো আইসিসির ইভেন্টগুলোতে অনেক আগেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে আলোচনার ভিত্তিতে একমত হয়ে আগেই অনুমোদন ও স্বাক্ষর করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।

মূলত বাংলাদেশসহ সবগুলো অংশগ্রহণকারী দেশের সম্মতি ও অনুমোদনের পরই এবারের বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলো চূড়ান্ত হয়েছে এবং তার ভিত্তিতেই বিশ্বকাপের সূচি চূড়ান্ত হয়েছে।

কিন্তু মোস্তাফিজুর রহমানকে ভারতীয় বোর্ডের নির্দেশনায় কেকেআর থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণার পর বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসার পর বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডও শক্ত অবস্থান নেয়।

বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম সোমবার সাংবাদিকদের বলেছেন, "আমরা ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলা নিরাপদ বোধ করছি না। আমরা চিঠিতে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছি কী বলতে চাইছি। আমাদের মনে হয়েছে, সেটা (নিরাপত্তা) একটা বড় দুশ্চিন্তা"।

ফলে শেষ পর্যন্ত ভারতে ম্যাচ না খেলার বিষয়ে আইসিসিকে জানিয়ে দেওয়ার পর এখন আর আইসিসির করণীয় কিছু আছে কি-না তা নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

কারণ এখন বাংলাদেশের প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় নিতে হলে বাংলাদেশের বিপক্ষে যেসব দলের খেলার কথা তাদেরকে শ্রীলঙ্কায় খেলতে রাজি করাতে হবে, যা এই মুহূর্তে সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে খেলতে শ্রীলঙ্কায় যায়নি অস্ট্রেলিয়া এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ভারত এবং পাকিস্তানের সাথে শ্রীলঙ্কাও ঐ টুর্নামেন্টের যৌথ আয়োজক ছিল। কিন্তু কলকাতায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরপরই অস্ট্রেলিয়া এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ জানিয়ে দেয়, নিরাপত্তার ভয়ে তারা শ্রীলঙ্কায় দল পাঠাবে না।

অন্যদিকে ২০০৩ সালের বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে জিম্বাবুয়েতে খেলতে যায়নি ইংল্যান্ড আর কেনিয়ায় যায়নি নিউজিল্যান্ড।

ওই সব ম্যাচে প্রতিপক্ষকে ওয়াকওভার বা জয়ের পয়েন্ট দিয়েছিল আইসিসি।

সবক্ষেত্রেই অনুপস্থিত দলের প্রতিপক্ষ ম্যাচে ওয়াকওভার বা পয়েন্ট পেয়েছে। ফলে, এবার শেষ পর্যন্ত বিসিবি ও আইসিসি কোনো সমঝোতায় উপনীত হতে না পারলে বাংলাদেশের ম্যাচগুলোতে প্রতিপক্ষের ওয়াকওভার পাবার সম্ভাবনাই দেখছেন ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচগুলোকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নিতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশের ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল

ছবির উৎস, Dr. Asif Nazrul/Facebook

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচগুলোকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নিতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশের ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল

মোস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে যা হয়েছে

মোস্তাফিজুর রহমানের বিষয়ে কেকেআরের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দুই দেশেই নিজ নিজ ব্যাপক প্রতিক্রিয়া এখনো দেখা যাচ্ছে।

এ ঘটনায় ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক মতাদর্শের অনেকে যেমন খুশি হয়েছেন, তেমনি বাংলাদেশ তাদের বিশ্বকাপের ম্যাচ ভারত থেকে সরিয়ে নিতে আইসিসিকে চিঠি দেওয়ায় বাংলাদেশের ভারত বিরোধী মনোভাবের মানুষও নিশ্চিতভাবেই স্বস্তি পাচ্ছেন।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএল এর ১৯তম আসরের জন্য কোলকাতা নাইট রাইডার্স ৯ কোটি বিশ লাখ রুপিতে দলে নেয় বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে। আবুধাবিতে ঐ নিলাম অনুষ্ঠানটি হয় গত ১৬ই ডিসেম্বর।

ঐ ঘটনার পর থেকেই ভারতের কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন মোস্তাফিজকে দলে নেয়ার প্রতিবাদে কোলকাতা নাইট রাইডার্স ও দলটির একাংশের স্বত্বাধিকারী শাহরুখ খানের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন শুরু করে।

তাদের বক্তব্য ছিল যে কেকেআর ভারতীয়দের আবেগের বিরুদ্ধে গিয়ে 'বাংলাদেশি' খেলোয়াড়কে দলে নিয়েছে।

তাদের এমন অভিযোগের কারণ - বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সম্প্রতি দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশন অভিমুখে পদযাত্রা সহ বেশ কয়েকদফা প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করেছে। যে কারণে বাংলাদেশি খেলোয়াড় দল নেয়াকে ভারতীয়দের আবেগের বিরুদ্ধে যাওয়া বলে আখ্যায়িত করেছে তারা।

এর ধারাবাহিকতায় তেসরা জানুয়ারি ভারতের ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড, বিসিসিআই জানায় যে তারা কোলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশনা দিয়েছে যেন মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়।

এরপর বাংলাদেশ সরকাররে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজ থেকে দেওয়া স্ট্যাটাসে লিখেছেন যে 'বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত করার অনুরোধ জানানোর নির্দেশনা আমি দিয়েছি।'

তিনি ঐ স্ট্যাটাসের শেষ লাইনে লিখেছেন 'গোলামির দিন শেষ।'